Wednesday, 17 February 2016

রতন সিদ্দিকী : অনুভবের বোদ্ধা, সাহিত্যের কুসুম / ড. মোহাম্মদ আমীন

রতন সিদ্দিকী : অনুভবের বোদ্ধা, সংস্কৃতির কু

রতন সিদ্দিকী, খুব পরিচিত একটি নাম। দীর্ঘকাল হতে নামটির সঙ্গে আমার পরিচয়, তবে মানুষটির সঙ্গে নয়। ব্যক্তিগতভাবে পরিচয় হওয়ার পূর্ব-পর্যন্ত অভিজ্ঞানের নির্মাল্য বস্তুত বাঙ্ময় প্রফুল্লতা, রঙময় সাহিত্যকর্ম ও দিঙময়
শৈল্পিক প্রবারতায় সীমাবদ্ধ ছিল। নাম-পরিচিত, এ অপরিচিত মানুষটির সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর আমার কাছে আর একটি বিশাল অভিধায় উৎফুল্ল হয়ে ওঠেন। কর্ম-প্রকৃতির কারণে, রাষ্ট্রপ্রধান হতে শুরু করে খুব সাধারণ মানুষের সঙ্গেও গভীরভাবে মেলামেশার এবং খুব নিকট থেকে অবলোকনের সুযোগ আমার হয়েছে। মানুষ আমার সাহিত্যকর্মের উপাদান, তাই যে কোনো মানুষকে আমি গভীরভাবে নিরীক্ষণ করি। রতন সিদ্দিকীর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর পরই, তার মানবিক সম্পর্কের নিদাঘ অনুপমতার নিটোল একটা দিক আমার কাছে উন্মোচিত হয়। যা নিয়ে এতদিন আমি শুধু ভাবতাম, প্রত্যাশা করতাম, দেখতে চাইতাম কিন্তু পেতাম না, দুর্লভ ছিল বড়। ব্যক্তিত্ব, ক্ষমতা বা অবস্থানের নানা অজুহাতে মানুষের মাঝে  অহংবোধ নামের মলের মতো দুর্গান্ধময় এক জঞ্জাল তৈরি হয়, যে জঞ্জাল অতিক্রম করে মানুষে মানুষে নিবিড় সংযোগ স্থাপন করা অনেকের পক্ষে সম্ভব হয় না। যা পক্ষান্তরে মানুষের পাশবতাকে পরিস্ফুট করে তুলে। অধিকাংশ মানুষেই এটি দেখতাম। তবে রতন সিদ্দিকীর সঙ্গে পরিচয় এবং অল্পসময়ের মধ্যে ঘনিষ্টতা আমার এক নতুন অভিজ্ঞতার সূচনা ঘটায়। আমি বুঝতে পারলাম অসংখ্য হীন ও নিকৃষ্ট কাজ করার পরও কেন মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। মানুষের মাঝে রতন সিদ্দিকীদের মতো অনেক মানুষ আছেন, তাই মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। মানব জাতির  নৃশংসতাগুলো তারা বিমল স্নিগ্ধতার পরম লালিত্যের প্রশান্ত সুরভিতে ঢেকে রাখে।

মেনে নেওয়ার মতো প্রবল ধৈর্য ও সবল প্রয়োগ রতন সিদ্দিকীর ব্যক্তিগত চরিত্রের আর একটি উজ্জ্বল দিক। পারিবারিক জীবনের মতো কর্মজীবনেও তিনি মেনে নেওয়া সংস্কৃতির নির্ঝর ধারক। যেখানেই তিনি শিক্ষকতা করেছেন, চাকরি করেছেন- সেখানেই এ গুণটির জন্য প্রশংসতি হয়েছেন। এটি আমার কথা নয়, বিভিন্ন জায়গায় কর্মকালীন তার সহকর্মীদের কথা। অবশ্য এজন্য তাকে কষ্টও স্বীকার করতে হয়েছে প্রচুর। অনেকে তার ঔদার্যকে
দুর্বলতা ভেবে সুযোগ নিয়েছেন। তাতে তিনি কষ্ট পেলেও রূষ্ট হননি। রাস্তার পাশে যে গাছটি কণ্টককীন এবং ছায়া দেয় তপ্ত-শ্রান্ত পথিককে- সেটাকেই বেশি আঘাত পেতে হয়। তবু সে কি ছায়া দেওয়া থামিয়ে দেয়? কণ্টকিত হয়? না। ছায়াময় কিন্তু কণ্টকহীন বৃক্ষের মতো বিশাল হৃদয়ের মানুষ রতন সিদ্দিকী। এমন আকাশসম বিশাল হৃদয়ে, কষ্টের সাগরও হারিয়ে যায়। সামান্য কজন মানুষ তাকে কী কষ্ট দেবে! যত কষ্টই আসুক, সংস্কৃতিমনা, নাট্যপ্রেমি ও অসাম্প্রদায়িক চরিত্রের বিরল মাধুর্যের অধিকারী এ মানুষটির উদার হাসির বিহ্বল সাগরে নিমিষে হারিয়ে যায়- সব কষ্ট। পুরো পৃথিবীর সমস্ত অন্ধকার একত্রিত হলেও একটি প্রদীপের আলোকে ঢেকে রাখতে পারে না। বরং অন্ধকার যত গাঢ় হয়, প্রদীপের ছোট্ট আলোটি তত বিকশিত হয়। তেমনি বিকশি হন তিনি, রতন সিদ্দিকী; তাঁর হাসিতে  এবং সংস্কৃতির বাঁশীতে, নাটকের উন্মন উন্মাদনায়।

রতন সিদ্দিকী বিশ্বাস করেন  ঈর্ষা, অহমিকা, পরশ্রীকাতরতা প্রভৃতি মানুষের পাশবতার ঈন্ধন। শুধু কথায় নয়, তার আচার-আচরণ এবং ব্যবহারেও এর যথার্থ প্রয়োগ দেখা যায়। তিনি এমন একজন মানুষ, যার অন্তরে প্রবাহিত বন্ধু-প্রতীম নিবিড় সখ্যতার বৈশাল্য আমাজান-প্রবল স্রোতের মতো প্রচণ্ড গতিতে সকল ঈর্ষা, অহংবোধ আর পাশবতা ধুয়ে-মুছে তাকে অনুক্ষণ পরিষ্কার করে রেখে যায়। তাই তিনি থেকে যান চিরশুভ্র এবং স্বগীয় আবহে নিনাদিত মনের নিষ্পাপ মানুষ হয়ে। হাসির সঙ্গে উদাত্ত কথার অনিমেষ আতিথেয়তায় তিনি মুহূর্তে মুগ্ধ করে দিতে পারেন- যে কাউকে। আমি এমন বিরাট মনের আর সরল ছাপের বিরল মানুষ খুব কম দেখেছি। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, তার আচরণ আর অনুপম ব্যবহার। এসব তার পরিকল্পিত কিছু নয়, সম্পূর্ণ স্বভাবজাত এবং অকৃত্রিম। মনের গহীন থেকে স্বতঃস্ফুর্তভাবে উঠে আসা প্রত্যয়। শুধু তিনি নন, তার সহধর্মিনী ফাহমিদা হক কলির ক্ষেত্রের একই কথা প্রযোজ্য। আসলে যারা সাহিত্য-সংস্কৃতির মাঝে ডুবে থাকেন, তাদেরকে পার্থিব কোনো মলিনতা স্পর্শ করতে পারেন না।

সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় রতন সিদ্দিকীর দীপ্তময় পদচারণা বিনিদ্র আগ্রহের নীরব সুনিদ্রার মতো স্বপ্নময়। পরিবেশনায় তিনি অমিয়, বিনির্মাণে বৈচিত্র্যময় এবং পট পরিবর্তনে দারুণ কুশীলব। রতন সিদ্দিকী বাগ্মী। তিনি
প্রাবন্ধিক, গাল্পিক, সমালোচক, সাহিত্য বিশ্লেষক এবং আভিধানিক। তবে এগুলোর মাঝে যেটি সবচেয়ে আমি বেশি দেখি এবং আমাকে মোহিত করে বিমল শ্রদ্ধায় সেটি- তার ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে সাহিত্যকর্মের অবিচ্ছিন্নতা, সমিল-সততা আর প্রায়োগিক নির্মাল্য। তার প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিটি বেলা-অবেলা, চিন্তা-চেতনা, দৃষ্টিভঙ্গি, সময়-অসময়, গ্রহণ-বর্জন সাহিত্যকর্মের অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ হয়ে ফুটে ওঠে। বিন্দুমাত্র ফাঁক থাকে না, রাখতে পারেন না। রতন সিদ্দিকীকে বুঝলে তার সাহিত্যকর্ম এবং তার সাহিত্যকর্ম পড়লে তাকে পুরো এবং আগাগোড়া চেনা হয়ে যায়। এমন জীবনধর্মী এবং কথা ও কাজে সৎ সাহিত্যিক বাংলাদেশে আর কয়জন আছে আমি জানি না। ব্যক্তিগত চরিত্র আর প্রাত্যহিক কর্মের সঙ্গে সাহিত্যকের্মের কোনো ফাঁক নেই বলে রতন সিদ্দিকীর প্রতিটি লেখা, প্রতিটি রচনা, প্রতিটি গ্রন্থ প্রতিটি নাটক পাঠকের কাছে অনবদ্য উপদেশে আসীন হয়ে শিক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। তার সাহিত্যকর্মে আমি দেখি মানুষ, মানবতা, সারল্য, অমায়িকতা। আসলে তিনি অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিভূষিত বিশাল মনের নিপাট একজন মানুষ।

যুক্তির প্রাধান্য এবং গ্রহণের মানসিকতা রতন সিদ্দিকীর সাহিত্যকর্মের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক। ছোট ছোট বাক্যে শব্দের কলকল আর ছলছল চঞ্চলতা তার দক্ষ হাতের যাদুকরী স্পর্শে পটুয়ার কলমের পটুত্বে অনির্বাণ হয়ে ওঠে। এমন অভিনবত্ব দেখা যায় তার বক্তৃতায়। কোনোরূপ পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই যে কোনো বিষয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাঠককে ধরে রাখতে পারেন স্বপ্নমগ্ন সময়ের মতো। কোনদিকে চলে যায় এবং কীভাবে কেউ টের পাওয়ার আগে কথা শেষ হয়ে যায়। শুধু অবশেষ থাকে তালিমুখরিত শ্রোতৃবৃন্দের অবাক দৃষ্টি, এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল? এত তাড়াতাড়ি শেষ করে দিলেন স্যার? বক্তৃতায় উঠে এমন অনেক সুখকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি তাকে হতে হয়েছে। এতই চমৎকার তার বক্তৃতা।

প্রবন্ধ মানে নাকি প্রকৃষ্টবন্ধন। তো এ বন্ধন কার সঙ্গে- এ নিয়ে যতই মতভেদ থাকুক না কেন, প্রবন্ধ যে সাধারণত কঠিন ও নিরস- সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে রতন সিদ্দিকীর প্রবন্ধের ‘প্রকৃষ্ট বন্ধন’টা হয় পাঠকের সঙ্গে। সহজবোধ্য ভাষায় গল্পের মতো প্রবন্ধ চয়নে তার স্বকীয়তা আসলেই মুগ্ধকর। কোনো কোনো প্রবন্ধ গল্পের মতোই আকৃষ্ট করে রাখে পাঠককে। প্রবন্ধে তিনি গভীর অনুভবের অনুপুঙ্খ বিশ্লেষক, দূরদর্শী ভাবুক এবং সংস্কারপ্রত্যাশী প্রজন্মের ত্রিমুখী মোহনায় ফুলে ওঠা বিস্তৃতি। তার প্রবন্ধে অতীতের বিস্তারে বর্তমানের হাসি
অভিষ্যতের জন্য উৎফুল্ল হয়ে উঠে। তাই পাঠক বিমোহিত হয়ে পড়ে তার প্রবন্ধে, বুঝাই যায় না- আসলে গল্প না প্রবন্ধ। অন্যদিকে, গল্প ও নাটকে তিনি আত্মভোলা বাউল, মন্দ্রিত প্রপাতে  জীবনের শ্বাস, উত্থানের উল্লাস আর পতনের প্রদাহ এবং বর্ষাস্নাত সন্ধ্যায় নুপুরকণ্ঠী বসন। সাহিত্য সমালোচনায়?  সাবলীল কথকের মতো মুখর আর দার্শনিকের মতোই ধীর। ‘তমোঘ্নের কবি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান’, ‘হৃষিত নাট্যকার মমতাজ উদ্দিন’, ‘বাংলা সাহিত্যের অনিবার্য সংকেত  : মাইকেল থেকে মানিক’, ‘অর্চিত অতীত’, ‘ঊনিশ শতকের বাংলা নাটক লোকউপখ্যান’, ‘কতিপয় নাট্যকৃতি’, ‘কালের খেয়া’, ‘বারোয়ারি’ প্রভৃতি গবেষণা ও প্রবন্ধ গ্রন্থ পড়লে সহজে অনুধাবন করা যায়- তিনি প্রবন্ধ রচনায় তার বাঙ্ময়তার মতোই নির্ঝর। এসব গ্রন্থে রতন সিদ্দিকী গবেষণা, প্রবন্ধ ও সাহিত্য আলোচনার ক্ষেত্রকে স্বকীয় আদলে সার্বজনীন মগ্নতায় অভিভূত এক নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করেছেন। তিনি সাহিত্যের আলো, যুক্তির কুশীলব, অনুভবের বোদ্ধা এবং সাহিত্যের কুসুম এবং সংস্কৃতির নুপুর।
                                             
রতন সিদ্দিকীর রচনা যেমন সহজ-সহজ সরল তেমন সাবলীল ও প্রাঞ্জল।  ভাষা শৈলীর দিক থেকেও রচনায় রয়েছে বিবর্ধিত মাধুর্য এবং অন্তর্নিহিত অনুবোধ। লেখার সময় তিনি লিখে যান মনের আনন্দে এবং কোনো সচেতন প্রয়াস ছাড়াই এ আনন্দে প্লাবিত হয় পাঠক। তিনি জানেন, অধিক কঠিন ভাষা রচনার সৌন্দর্যহানি ঘটাতে পারে এবং পাঠককে করতে পারে পাঠবিমুখ। তাই তিনি প্রতিটি বাক্য নিজের মতো অনুপমতায় তুলে ধরেন সরল ভাষায় সহজবোধ্য অনুচয়নে। আনন্দের সঙ্গে জ্ঞানার্জন  তার রচনার আর একটি বিশেষ দিক।  যে লেখা থেকে পাঠক কিছু শিখতে পারে না, যে লেখা লেখা পড়ে মানবীয় অনুভূতির সুকুমার প্রগলভতার সুষমিত বিকাশ জেগে উঠে না, সেগুলো রচনা নয়, বঞ্চনা। তিনি এ ব্যাপারে বেশ সচেতন, বেশ সতর্ক। তাই তার লেখা পড়ে পাঠক কখনও বঞ্চিত হন না। তিনি লেখেন পাঠককে আনন্দ দেওয়ার জন্য, ভাবেন পাঠকের অনুভূতিকে জাগ্রত করার কৌশল। তাই রতন সিদ্দিকীর লেখায় আনন্দ ও জ্ঞান- দুটো সমমাত্রিক সরলতায় বিদ্যমান। সংগত কারণে শিশু থেকে বুড়ো-সবার কাছে তার লেখা, তার রচনা সমাদরে গ্রহণীয়।

রতন সিদ্দিকী দেশপ্রেমিক, স্বাধীনতা তাঁর  রক্তের ঋণ, দেশ নিঃশ্বাসের অম্লজান। দুটোই অনিবার্য, দুটোই জীবনের গভীর ব্যাকুলতায় প্রতিনিয়ত উথলে উঠা আগামীর স্বপ্নবিছানো বর্ণীল ছাদর। এখানে ব্যক্তির মুক্তি, জাতির অগ্রায়ণ এবং বিশ্বশান্তির স্বরূপ নিহিত। তাই বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে তিনি স্বাধীনতাকামী। ছাত্র জীবনেও তার  এ
বোধ সহপাঠী ও অন্যান্যদের দৃষ্টি কেড়েছে। সত্য কথা সবসময় বলা যায় না, অনেক বিপদ, অনেক যাতনা। সত্য বলার জন্য প্রচণ্ড সাহস, মার্ত্যণ্ড আত্মবিশ্বাস, অনিমেষ সহনশীলতা এবং সর্বোপরি মননশীল আবেগে উদ্দীপ্ত থাকার চেতনা প্রয়োজন। রতন সিদ্দিকীর এগুলো ছিল এবং আছে। তাই তার সাহিত্যকর্মে সাহস, আত্মবিশ্বাস, সহনশীলতা, মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তচিন্তা, অসাম্প্রদায়িকতা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আর মননশীল আবেগের অপূর্ব সমন্বয় পরিলক্ষিত হয়। যার এগুলো আছে তাঁর  লেখায়-বলায় অধিক কিছুর প্রয়োজন হয় না। গন্তব্যের অনুসন্ধান, একাত্তর ও একজন কুমারী, বারবণিতা প্রভৃতি উপন্যাসে মানুষ, দেশ, ধর্ম, রাজনীতি, প্রাত্যহিক সাংঘর্ষিকতায় জীবনের মাধুর্য নিপুণ ভাষায় পরিস্ফুট। বিশে চৈত্রের সকালে, গৃহবৈরী প্রভৃতি তার গল্প এবং টমের কথা, ফেল্টুস ভাই, রিনির স্যার, মডেল স্কুলের মানিক প্রভৃতি শিশুতোষ সাহিত্য। প্রমিত বাংলা উচ্চারণ অভিধান ও প্রমিত বাংলা বানান অভিধান বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে বহুল পাঠ্য দুটি গ্রন্থ। নাটক রচনাতেও তিনি সিদ্ধহস্ত। বৌবসন্তি, রতন সিদ্দিকীর একটি উল্লেখযোগ্য নাটক।

সমকালীন জীবনবোধ, আর্থ-সামাজিক ও রাজনীতিক প্রেক্ষপটের সঙ্গে সঙ্গে মানব জীবনের জটিল অনুভূতির বৈচিত্র্যময় প্রেমস্বত্বার মোহময় উদ্ভাসন রতন সিদ্দিকীর সাহিত্যকর্মের নিপূণ অলঙ্কার। প্রবন্ধ বা গল্প, গবেষণা বা সমালোচনা- যাই হোক; শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কাহিনি ও পরম্পরা বিন্যাস অভিনব মুগ্ধতায় মোহময় পরিণতির অপেক্ষায় পাঠকের হৃদয়কে অস্থির করে রাখে। কথোপকথন, প্রাসঙ্গিকতা, সযুশ্যময়  পরিবেশ-চয়ন, আবেগ নিয়ন্ত্রিত প্রবেগ, লিপ্সা-নিস্পৃহ দৃষ্টিভঙ্গি প্রভৃতি রতন সিদ্দিকীর সাহিত্য কর্মকে অধির মদিরতায় আবেশিত করে রাখে। বাস্তবতার আলোকে জীবনবোধের
নিপুণ কাহিনির সাবলীল সৌকুমার্য, জ্যোস্নার মতো নিস্তব্ধ প্রমুগ্ধতা, নদীর মতো অস্থির তরঙ্গ তার সাহিত্য কর্মের ব্যাকুল ঝড়ের আকুল পূর্বাভাস। তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে ভাষা। যেন অপূর্ব বাক্য থরে থরে থোড়ায় থোড়ায় জীবনবন্দি বাস্তবতার  অহর্নিশ প্রতীক্ষা। যা কোনও অবিশ্বাস্য ঘটনাকেও পাঠকের কাছে স্বতসিদ্ধ বাস্তবতায় মুখর করে তুলে। ব্যতিক্রমী উপস্থাপনায় সর্বজনীন পরিব্যাপ্তির মদিরতা পাঠককে গল্প থেকে বাস্তবে নিয়ে যায়। কারণ আছে এর। তার সাহিত্যকর্ম অভিজ্ঞতার তিল তিল প্রতিফলনে গড়ে উঠা আবাদি সবুজের স্বপ্নীল ফলক। এখানে কষ্ট আছে, শ্রম আছে; আছে পাওয়ার আনন্দে পুলকিত হবার বাসনা আবার হারানোর বেদনায় অশ্রুভগ্ন দিশা। তাই রতন সিদ্দিকীর লেখা তার মতোই উচ্ছ্বল হাসির প্রাণোচ্ছ্বল নির্ঝরতা এবং মনবোধের অবিশ্রান্ত ধারা। আমার ভালো লাগার একজন তাই তিনি।

অবশেষে :
লেখাটি শেষ হওয়ার পর আমার ছেলে পড়ে বলল : ‘তার’ বানানে চন্দ্রবিন্দু দাও। তিনি সম্মানিত ব্যক্তি। সম্মানিত ব্যক্তিদের সর্বনামে বাংলায় চন্দ্রবিন্দু দিতে হয়।
আমি বললাম : দেব না।
কেন দেবে না?
রতন সিদ্দিকী চন্দ্রবিন্দু নন, চন্দ্র। তিনি ব্যক্তি নন কেবল, আলো, জ্যোতি। তাকে বিন্দুতে বিশেষায়িত করার স্পর্ধা অন্তত আমার নেই।

বিশেষ দ্রষ্টব্য : এটি খসড়া। বানান ভুল থাকবে। মন্তব্য কলামে সংশোধন কাম্য।



Monday, 15 February 2016

এম এল গনি : জীবনবোধে উদ্দীপ্ত অনুভূতির প্রমুগ্ধ দার্শনিক


এম এল গনি, পুরো নাম মোহাম্মদ লোকমান গনি। বাংলাদেশে জন্ম, কানাডায় থাকেন দীর্ঘদিন। পেশায় প্রকৌশলী কিন্তু নেশায়?

এ কথাটি বলার জন্য কলাম ধরা। প্রকৌশলীর মতো নিবিড় ও বিশেষায়িত কাজে মগ্ন থেকেও তিনি লিখেছেন একটি বই, বই মানে বিজ্ঞানের বা যন্ত্রের কোনো বই নয়,
সাহিত্যকর্ম, আবার যেনতেন সাহিত্যকর্ম নয়, সাহিত্যের রাজা গল্প। তার গ্রন্থের নাম ‘কচি চেহারার বিড়ম্বনা’। নামেই একটা মাদকতা, কেমন বিড়ম্বনা কচি চেহারায়? তা জানার জন্য পড়তে বাধ্য হলাম বইটি। পড়তে পড়তে অবশেষে নিজেকে আবিষ্কার করলাম- এম এল গনির মাঝে, তিনি লেখক, তিনি দার্শনিক, তিনি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে চোখরাখা এক বিদর্শী অভিভাবক। চলতে চলতে আমরা চলি, গনি চলেন না শুধু; চোখকান খোলা রেখে দেখেন, বলেন এবং শেখান। এখানেই পার্থক্য আমাদের এবং গনিদের। ‘কচি চেহারার বিড়ম্বনা’ একটি গল্পসংগ্রহ। তবে কোনো রূপকথার গল্প নয়, জীবন থেকে নেওয়া আমাদের চারপাশে সতত সঞ্চরণশীল ঘটনার গভীর রেখাপাত। প্রত্যহ কত ঘটনা ঘটে যাচ্ছে আমাদের চারপাশে- কয়টাই বা আমরা দেখি, কয়টা বা বুঝতে পারি- কিন্তু যাদের অর্ন্তদৃষ্টি আছে, আছে সহানুভূতির মর্মবোধ তাদের চোখে কিন্তু কিছু এড়ায় না। জীবন তাদের কাছে প্রকৃতির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য একটি ক্যানভাস। তাই তাদের তুলি অতুলনীয় হয়ে ওঠে ক্যানভাসের পরতে পরতে সজ্জায় সজ্জায়। এম এল গনি এমন একজন অনুভূতিপ্রবণ লেখক, যার দৃষ্টি কানাডার জলপ্রপাতের মতো স্বচ্ছ এবং চিন্তা প্রকৃতির মতো নিবিড় আর উদারতা বাক্যের মতো নির্মল।

‘কচি চেহারার বিড়ম্বনা’ তার প্রথম গ্রন্থ। ২৭টি ভিন্ন স্বাদের ভিন্ন অনুভূতির গল্প নিয়ে বইটির অবয়ব। প্রতিটি গল্পে গল্পকার নতুনভাবে নতুন আঙ্গিকে পরিবেশ-প্রতিবেশ ও প্রাত্যাহিকতাকে বিশ্লেষণ করেছেন। গল্পগুলো হচ্ছে : কচি চেহারার বিড়ম্বনা, কুপোকাৎ, মারপ্যাচ, সততার সিন্ধুঘোটক, যুক্তিতে মুক্তি, নাপিত বন্ধুর আক্ষেপ, একটি ফেইসবুকীয় কল্পকাহিনি, কাজ তো কাজই, কাঙ্গাল, মুক্তিযুদ্ধের শিশুবীর, ভাইবোনের গিফট, একচিলতে শৈশব, স্কুলিং : এদেশ-ওদেশ, গোলমেলে, ইহুদি-নাসারার দেশ, বয়সবিষয়ক প্যাঁচাল, ঠোঁটকাটা, কমলা, অভিযোগ, খোয়াব, দুর্বিপাকের একদিন, লেঅফ প্রুফ মনি ভাই, কলাম্বিয়া  আইসফিল্ড দর্শন ও কিরণের পর্বত অবরোহণ, ফুলিনি ও চৌধুরী নানার গল্প, চেনা-অচেনা, জলের মানুষ এবং একুশের ভাষণ। প্রথম গল্পে তিনি নিজেকে নিজের মতো করে সম্পূর্ণ স্বকীয়তায় প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন। প্রথম গ্রন্থে এরকম কৃতিত্বের সাক্ষর রাখা সবার পক্ষে সম্ভব হয় না। লেখক প্রকৌশলী হলেও গ্রন্থটি পড়লে মনে হবে তিনি শুধু যন্ত্র নিয়ে, কাঠ বা লোহালক্কর নিয়ে থাকেন না, মানুষের মন নিয়েও তার প্রচুর অভিজ্ঞতা এবং নিবিড় অধ্যয়ন আছে। যন্ত্রের মতো প্রতিটি ঘটনাকে তিনি খুটিয়ে খুটিয়ে আবেগঘন চোখে মন দিয়ে অনুভব
করেন। গল্পগুলো পড়লে অবাক হয়ে যেতে হয়, তিনি এত ব্যস্ততার মাঝেও কীভাবে জীবনকে এত আয়েসের মাধ্যমে অনুভব করার ইচ্ছাকে সতেজ রাখতে সক্ষম হয়েছেন। নিশ্চয় তার কৃষ্টি আর ঐতিহ্যের সঙ্গে অধ্যয়নের বিরল যোগসূত্র এমন অনবদ্যতার কারণ। তিনি লিখেছেন মনের আবেশে নিলয় বিকাশে। যা দেখেছেন  অবিকল তুলে ধরেছেন নিজের মনে তবে ঘটনার ভাষায়, বিস্তৃত অবলীলায়। কানাডা-আমেরিকায় বসবাসরত বাঙালির প্রাত্যহিক জীবন, চালচলন, দৃষ্টিভঙ্গি, আর্থসামাজিক অবস্থা, ধর্মীয় টানাপোড়েন, সাংস্কৃতিক বিম্বতা, দ্বান্দ্বিক মৌনতা প্রভৃতি এবং ওই দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনামূলক অবস্থানকে ঘটনায় ঘটনায় অপূর্ব কৃতিত্বে তুলে ধরেছেন এম এল গনি, তার কচি চেহারার বিড়ম্বনায়।  এম এল গনির লেখায় আধুনিকতা একটি প্রোজ্জ্বল বিকাশ। তবে, আর একটি বিষয় না-বললে নয়, লেখক শুধু আধুনিকতায় সীমাবদ্ধ থাকেননি। তিনি দৃষ্টিভঙ্গি আর প্রাত্যহিকতাকে অতীতের মাঝে ডুবিয়ে, অতীতের কোড়কে এনে বর্তমানের থালায় ভবিষ্যতের জন্য পরিবেশন করেছেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মন্দ্রিত আবেগ বর্ণনার বর্ণছটায় উথলে উঠেছে, হয়তো কিছুটা বা উছলেও। তবে এটি লেখকের উচ্ছ্বাসের তারুন্যে উপলব্ধির নিকষ বর্ণনার প্রয়াস। এটি তার তারুণ্য এবং আবেগের কারণে ঘটেছে। যা গল্পকে কিন্তু আরও রসালো করে তুলেছে। একজন তরুণী বইটি কিনছিলেন, আমি তার কাজে জানতে চাইলাম কেন কিনলে বইটা? ‍তুমি কী লেখকের পরিচিত?না। নামটা দেখে মুগ্ধ হয়ে।  আমাকেও চেহারা নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়ে। আমি জানতে চাইছি, লেখক কচি চেহারা নিয়ে কী বিড়ম্বনায় পড়েছেন এবং এত সুন্দর একটা নাম কীভাবে দিতে পেরেছেন। তার নামটি আমাকে ছুঁয়ে গেছে। পরদিন তরুণী আমাকে জানালেন বইটি পড়ে তিনি মুগ্ধ হয়েছেন। আরও বলেছেন, আজকের পাঠকের কেন হুমায়ুন-জাফর মার্কা সস্তাদরের ও নিম্নমানের বই পড়েন বুঝতে তার কষ্ট হয়। তার চোখে এম এল গনির বইটি তথাকথিত বর্তমান হুমায়ুন কিংবা জাফর ইকবালের বইয়ের তুলনায় অনেক বেশি আবেদনময়। লেখা, লেখকের মুখচ্ছবি।  কচি চেহারার বিড়ম্বনা এম এল গণির অবয়ব। তার লেখায়, তার বাক্যে আর শব্দে আছে প্রাত্যহিক জীবনের সাংঘর্ষিকতায় মানুষের বিপ্রতীপ কর্মকাণ্ডের সপ্রতীভ অনুধ্যায়।

 বইটির ফ্ল্যাপ-বাণী দিয়েছেন আনিসুল হক। এম এল গণি লেখক হবার জন্য লেখেননি। 
মনের আনন্দে জীবন ও বাস্তবতা হতে উৎসরিত প্রেরণাকে স্থায়িত্ব দেওয়ার জন্য লিখেছেন। তাই তার লেখা অনেক স্নিগ্ধ, অনেক নিবিড়, নিপুণ আর নির্ঝর। তিনি লিখেছেন হৃদয়র গভীর থেকে সচেতন কৃষ্টতায়, সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য নয়। এখানেই তফাৎ সস্তাজনপ্রিয়তা প্রত্যাশী লেখক আর এম এল গনিতে। 

আহমদ ছফা বলতেন, বাংলাদেশে জনপ্রিয় হতে হলে রিক্সাওয়ালা মানের বই লিখতে হবে, কারণ এখানকার অধিকাংশ পাঠক ওই মানের। সে তুলনায় এম এল গনির গল্প অনেক বেশি জীবনধর্মী। জীবনের গভীর গভীরতার অতল অতলান্ত থেকে তিনি তুলে এনেছেন বিন্দু বিন্দু রসদ। কচি চেহারার বিড়ম্বনা গল্প নয় শুধু, গভীর অনুভূতির প্রমুগ্ধ কাব্য। ভবিষ্যত তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। 

সালাহউদ্দিন আহাম্মদ : শব্দ সজাগ কবি প্রেম আর দ্রোহে / ড. মোহাম্মদ আমীন

ভালবাসা দিবসের কথা দিয়ে শুরু করি। আমার কথা নয়, আমি গবেষণা করি, গদ্য লিখি, আমার ভালবাসার প্রকাশে কবির মতো নিবিড়তা নেই মগ্নতার, মুগ্ধতা নেই বর্ণনার, আমি কবি নই, তাই ভালবাসার কথা হৃদয় দিয়ে ফুটলেও মুখ বা ভাষা দিয়ে একলাইনও বের করতে পারি না। যা বের হয় তা আনুষ্ঠানিকতাভর্তি উপহারের মতো নিরস। কিন্তু কবি পারেন, যেমন পেরেছেন ভালবাসার কবি সালাহাউদ্দিন আহাম্মদ। তৃপ্তিময় মাদকতায় বাক্যে বাক্যে কী ঘোর নেশা ছড়িয়ে বসন্তের মতো প্রগলভতায় বলে দিলেন ভালবাসার কথা :  
"অশ্রুতে তোমার শরীর ভেজাও
অনুভব করো আমায়;

লাজুক জ্যোৎস্না আমি

ভোর এনে দেবো তোমায়।" (প্রতিশ্রুতি/জলের নামতা)


ভালবাসার কবি সালাহউদ্দিন তার কবিতায় শব্দের ফাঁদে বড় মধুর আদরে আটকে দিলেন ভালবাসার
সব উচ্ছ্বাসকে! কত প্রাগাঢ় সংকোচে নিঃসঙ্কচিত্তে শব্দেরা তার অনুগত হয়ে গেল। আমি অবাক হয়ে পড়ে যেতে থাকি- কবিতার পর কবিতা। কবিতায় এমন মোহরস সৃষ্টি করতে পারা কবির অর্ন্তানুভুতির প্রাঞ্জলতাকে ফুটিয়ে তোলে। উপরের লাইনগুলো শুধু ব্যক্তি নয়, শুধু ভালবাসা মাত্র নয়; এখানে কবির অভিব্যক্তির সুধা ব্যক্তি হতে ব্যক্তির অন্তরে এবং অন্তর হতে বিশ্বে বিমর্জিত, বিভাসিত। তাই ভালবাসার মাঝে কবির ভোরের স্বপ্ন শুধু নিজের জন্য নয়, পুরো মানবজাতির প্রতি উৎসর্গিত। এমন কেবল কবিরাই পারে, তাই কবিরা আমৃত্যু শিশু।এমন শিশুকে বুঝতে হলে যে বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষ আর হৃদ্যিক কাব্যিকতা প্রয়োজন তা অনেকের নেই। এজন্য, আমাদের দেশে কবিতার পাঠক তুলনামূলকভাবে কম। এটা কবিতার লজ্জা নয়, বরং  যারা কবিতা বুঝেন না তাদের লজ্জা। হীরা এক আউন্স যথেষ্ট, লোহা একমণও নয়। কবিতায় যিনি বা যারা সাবলীল হয়ে উঠার জন্য শ্রম দেন না, তেমন পাঠক, কবিরা যতই প্রত্যাশা করুন, কবিতা কখনও চায় না। কবিতার মতো গর্বিত নান্দনিকতাময় পাঠকই কেবল কবিতার কাম্য।

যাই হোক, ফিরে আসি আসল কথায়। আজই পেলাম কবি সালাহউদ্দিন আহাম্মদরে দুটো কাব্য : ‘জলের নামতা’ এবং ‘একত্র অনুভব’। মলাট খুলে কোনটা আগে পড়ব ভাবতে ভাবতে হাত এগিয়ে যায় চোখসহ জলের নামতায়। বসন্তের এমন জল প্রশান্তের গোলাপে রমণীর মাথার কৃষ্ণ বেণী যেন। এমন জল এবং এমন নামতা, সর্বোপরি এমন জলের নামতা আকৃষ্ট করার মতোই। আমি আকৃষ্ট হয়ে যাই জলের নামতায়, সালাহউদ্দিন আহাম্মদের কবিতায়। প্রথম কবিতায় প্রবল ঝড়, ঝড় নয়; মনোহরী স্বর, সবুজ সাদায় মেঘে মেঘে বিস্ময়ের অনুস্বর।
“কীসের জল বেশি?
মেঘের না চোখের?
কার পরিধি বড়?
জলাশয় না অনুভূতি?” প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে প্রশ্ন দিয়ে এবং প্রশ্ন দিয়েই শেষ করেলেন কবি, তার জলের নামতা।
“অনুভূতির চেয়ে বড় আর কি (কী) হতে পারে?
কান্নার চেয়ে বেশী (বেশি) জল কার হতে পারে?” (জলের নামতা)

জীবন আর অনুভূতির এমন অনুভূতিহীন সাম্রাজ্যের আপতিত নিপতনে প্রশ্ন ছাড়া আর কী আছে! কিছু নেই, শেষ নেই, শুরুও কী আছে? কবি ঠিকই বুঝতে পেরেছেন, জীবন রহস্যের পার্থিব চঞ্চলতায় আধ্যাত্মিক বিমূর্ততার উত্তরহীন প্রশ্ন। এটি তার দার্শনিক অনুমেধার বিজ্ঞপ্রহর; এখানে প্রশ্ন ছাড়া আর কিছু নেই। উত্তর চাওয়া মানে আরও বড় প্রশ্নের জন্ম দেওয়া। অত বোকা কবি নন। তাই তিনি উদাস কণ্ঠে বলে ওঠেন :
“এক নীল স্বপ্নের পূজক
তুমি কই?
এতো (এ তো) দেখি শূন্য দারোয়ান।” ( তুমি-১, জলের নামতা)

সালাহউদ্দিন আহাম্মদের কবিতায় প্রেমের নিবিড়তা আবেগের মুর্ছনায় প্রকৃতি হয়ে ওঠে গগন কোণে মনের অভিসারে প্রেমের কুহকে। প্রেমের সঙ্গে প্রকৃতি আর প্রকৃতির সঙ্গে প্রেম ও কৃষ্ণায়ন-দ্রোহের জটিল মিলনে ভারী ওস্তাদ তিনি। সোহাগ পরিসরে তিনি যতই
আবেগময় হোক না কেন, শব্দচয়নে বেশ সচেতন। এমন প্রেমমুখর শব্দ সচেতনতা সালাহউদ্দিনের কবিতাকে আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বে মন্দ্রিত শাড়ি পরিয়ে রেখেছে স্নিগ্ধ রমনীর পুষ্ট বক্ষে। এ শাড়ি নিটোল যাতনায় কাছে যাবার আকুতিকে সীমাহীন ক্ষুধায় বন্য করে তোলে এবং, আবার সংযত চেতনায় করে রাখে অমায়িক, চোখে জ্বলে উঠে চোখ, মনে ঝাপটা মারে খনখনে ঢেউ। প্রেমকুহরে পাশব বন্যতা ঢেকে - সখার সঙ্গে মিলিত হতে পারার, সখাকে আকৃষ্ট করতে পারার কৌশলই তো প্রেম। নইলে কী পার্থক্য প্রেম আর ধর্ষণে। সালাহউদ্দিন আহাম্মদ জানেন, ভালাবাসা কী। তার কবিতায় মানুষের ভালবাসা সীমাহীন সাম্যতায় বিশাল হয়ে ওঠে। কোনো অস্ত্র নয়, সম্পদ নয়, ভালবাসা এবং ভালবাসাই তার কাছে প্রথম, প্রধান ও অম্লান অবিরাম :
“আকাশকে বিবর্ণ করার শক্তি
শুধুমাত্র ভালোবাসাই রাখে।” (বিচ্ছিন্ন হৃদয়, জলের নামতা)।

সালাহউদ্দিন আহাম্মদের কবিতা বর্ষণমুখর রাতের প্রাণোচ্ছ্বল টিন, ঝমঝম শব্দে মায়ের আদর, প্রেমিকার সাদর, দেশের নৈকট্য আর মনের প্রশান্তি। হৃদয়কে ভাষায়, অক্ষরকে শব্দের সজ্জায় বাক্যে বাক্যে বেশ কৌশলে বসাতে পারেন তিনি। লাইনের পর লাইন, ছেদের পর বিচ্ছেদ - আবার শুরু হঠাৎ, ঠিক কপোত-কপোতির উন্মুখ  ঠোঁটাঠুটির মতো। এমন মোহকল্পতায় তার কবিতাগুলো মাথায় কেমন ঝিমঝিম বর্ষায় রিমঝিম হয়ে ওঠে। মানবস্পন্দনের অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়গুলোও তার কবিতায় প্রেম-বেদনায় সোঁদাগণ্ধের মাটির মতো গ্রামীণ কণ্ঠে বাঁশী হয়ে ওঠে রাখালের কান্নায়। তিনি শহুরে, কিন্তু মন পড়ে থাকে গ্রামের সে সবুজ প্রান্তরে। যেখানে তার মায়া বালি হয়ে নাকে ঢুকে, শহরের মতো অ্যাজমা হয়ে নয়। তিনি আবার ফিরে যেতে চান মাটির মাঠে, কাঠহীন খাটে। স্পষ্ট আবেগ বিরল প্রকাশ কবির :

“মেঘলা মহৎ কবিতার উদ্দেশ্যে এই মাটি, এই সবুজ ঘাস পেরিয়ে
তারপর সাজানো দোকান হতে লবঙ্গের ঘ্রাণ শুঁকে শুঁকে অবশেষে
শাওনের ধারার মতো বিশাল বেদনা হয়ে ঝরেছি নিঃশব্দে হঠাৎ।” (বেদনায় বেঁধেছি হাত, জলের নামতা)

‘একত্র অনুভব’ নাম দেখে উপন্যাস মনে হয়েছিল, পুরুষালী নাম। উল্টে দেখি উপন্যাস নয়, কাব্য। সারি সারি কবিতা টিয়ার সজীবতায় সবুজে সবুজে পতপত। ‘জলের নামতা’র চেয়েও আরও ঘন, আর বাঙ্ময় আবেগের রোদ। এখানে সন্ধ্যা যেন থেমে আছে রাতের জন্য আর রাত থেমে আছে সন্ধ্যার কুহকতায়। রূপোলি বিকেলের মাঝে মানুষ আর প্রকৃতির নৈকট্যের মতো সালাহউদ্দিন আহাম্মদের কবিতাগুলো আমাকে নিবিড় করে নেয় কবিতার উষ্ণবুকে, শীৎকার ব্যাকুলতার অধরে। আমি নধর হয়ে চুষের যাতনায় অস্থির হয়ে উঠি কবির কবিতায়। তো এমন একটা  কাব্যের নাম ‘একত্র অনুভব’, অনেকটা ছেলের নামে পুরুষ। হোক না, তাতে কী! একটু ভিন্নতা তো প্রয়োজন। কাব্যে, কবিতায় এত ভাবাভাবি কী! কবির ভাষায় :
“স্বপ্নের সুদে ভালোবাসা ধার নিলাম।
---------------------
লাভ ক্ষতির হিসাব কষে ভালোবাসা হয় না।” (ভালোবাসার পাটিগণিত, একত্র অনুভব)।

ভেবেছিলাম পড়ে পড়ব। কিন্তু পড়ে আর পড়া হলো না, পড়েই শেষ করতে হলো। খেতে ডাকছিল বার
বার, বাধ্য হয়ে কাব্য নিয়ে খেতে গেলাম। কবিতার সাথে দুপুরের খাওয়া- অনবদ্য অনুভুতি। আলাপ করতে গিয়ে থেমে যাই, সালাহউদ্দিন আহাম্মদের কথাগুলো মনে পড়ে যাই : “আজ প্রথম বই মেলায় যাচ্ছি পুরো পরিবার। ছেলেমেয়েদের বায়না একশ বই কিনবে প্রত্যেকে।আমি বলেছি যতগুলি পছন্দ হয় কিনো বাকি সংখ্যা আমার বই দিয়ে মিলিয়ে দিব।ওরা বলল তুমি পচা লেখো।কবিতা কিছু হয়না, কবিতা হবে হাট্টিমাটিম টিমের মতো। ওদের পছন্দ শাহরিয়ার খান, জাফর ইকবাল, আহসান হাবীব, আনিসুল হক, ইমদাদুল হক মিলন, হূমায়ুন আহমেদ।আমি কবির চান্দের গুল্টু মামার বাঘ শিকারের বিষয়ে আগ্রহী করে যাচ্ছি।ওদের কথা মেলায় যাই দেখি তোমার বন্ধু আমাদের জন্য কেমন লিখেছে কয়েকটা লাইন মাত্র, এটি পড়ে বুঝে নিলাম সালাহউদ্দিন আহাম্মদ কবিতার মতো গদ্যেও সাবললীল। শব্দেরা এখানেও তার অনুগত। কবির আক্ষেপ, আগামী প্রজন্ম কবিতা হতে দূরে সরে যাচ্ছে, মানে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক মান ক্রমশ নিচে নেমে যাচ্ছে।   বস্তাপচা উপন্যাসের ভীড়ে পচে যাচ্ছে আগামী প্রজন্মের সাহিত্যমন। আহমদ ছফার ভাষায় বলা যায়, পাকিস্তানিরা বাংলা ভাষার যা ক্ষতি করেনি, তার সহস্রগুণ করে যাচ্ছে হুমায়ুন মার্কা লেখকেরা। এদের প্রতিহত করতে না-পারলে বাংলা ভাষার মান আরও কমে যাবে।

‘একত্র অনুভবে’ এখানে একটির পর একটি কবিতা নতুন বিষয় নেয়ে আবির্ভূত হচ্ছে। ভালবাসার পর প্রেম, তারপর বেদনা, দ্রোহ, সমাজ, রাষ্ট্র, জীবন, প্রাত্যহিক জীবন, সাংঘর্ষিকতা- এ এক বিচিত্র সংযোজন। হয়তো এজন্যই কবি নাম দিয়েছেন ‘একত্র অনুভব’।সালাহউদ্দিন আহমদের এ কাব্যটি আসলেই একটি ‘একত্র অনুভবের’ বিশাল সংযোজন। জন্ম হতে মৃত্যু তারপর আবার জন্ম হতে শুরু আবার মৃত্যু – এভাবে অন্তহীন বিষয়ের অবিশ্রান্ত প্রকাশ। দর্শন আর মৌনতায় প্রকট হয়ে উঠেছে তার ভালবাসা :
“ভালোবাসা পানির মত
কঠিন
তরল বায়বীয়”। (ভালোবাসার নামতা)

এত চমৎকারভাবে, এত সহজ ভাষায় শিশুদের মতো নামতায় নামতায় ভালবাসাকে কী অমোঘ নির্ঘুমতায় ঢেকে দিয়েছেন কবি সালাহউদ্দিন আহাম্মদ, সত্যি মুগ্ধ না-হয়ে পারা যায় না। প্রশ্ন সমাচ্ছন্নতায় কবির কাছে জীবন আর মৃত্যু দুটোই সমান। দুটোই অশেষ প্রশ্নের বিশেষ পরাবাস্তব। তাই জীবনের মতো ‘মৃত্যু’কেও তিনি প্রশ্নের পর প্রশ্ন দিয়ে ভালবাসা দিবসের লাল-নীল-হলুদ-সবুজ-কমলা এবং সবার নিলয় মিশ্রণে সাজিয়েছে প্রশ্নে প্রশ্নে :
“মানুষ ভাবে মৃত্যু অন্ধকারের মতো
আসলে কি তাই?
আমি ভাবি আলোকিত-সাদা কিংবা হলুদ।
নীল বা কালো - - -।” (মৃত্যু, একত্র অনুভব)।

ভালবাসার প্রবল আবেগেও কবি সমাজ সচেতন, মানুষের প্রতি, সমাজের প্রতি, ব্যক্তির প্রতি, রাষ্ট্রের প্রতি এবং পরিবার ও নিজের প্রতি সম্পূর্ণ সজাগ। এ বিষয়ে তার অবস্থান কবিতায় কবিতায় জীবনের মতো পরিষ্কার, এ বিষয়ে  উচ্ছ্বল তার কবিতা নিম্নগ অভিমানে। যেখানে মানবতা বঞ্চিত হয়, লাঞ্ছিত হয় সাধারণ, সেখানিই তিনি ঘৃণা ছুড়েন কবিতায় কবিতায়। তার সমাজ-জীবনমূলক কবিতাগুলো নান্দনিক ঘরণায় সাধারণ মানুষের পক্ষে উচ্চকিত। মানবতার কাছে পাশবতার পরাজয়ই তার এসব কবিতায় বিবর্ধিত। তাই তিনি ভালবাসার কবি, প্রকৃতির দ্রোহ এবং মননশীলতার গ্রন্থ।  ‘একত্র অনুভব’ কাব্যের ‘দৃষ্টিভঙ্গি’ কবিতায় কবির ক্ষোভ ফুটে উঠেছে অগ্নিপ্রমত্ততায় :

“ইচ্ছে করে হাতে যা পাই তা দিয়েই দেই (দিই) কোপ শালা তোদের।”

ভালবাসার প্রবল স্রোতে নান্দনিকতার কবি সালাহউদ্দিন আহাম্মদ কী মারাত্মক যাতনায় দ্রোহী হয়ে উঠেছেন তা সহজে অনুমেয়। সালাহউদ্দিন সাহসী, প্রেম আর দ্রোহ এবং প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সখ্যতা
তার কাব্যের উপাদান, জীবনের শ্বাস এবং আজন্ম বিশ্বাস। তার এ বোধ হৃদয়ের অতল হতে কলম বেয়ে নেমে আসে শব্দ হয়ে। কিন্তু শব্দগুলো শব্দের ইচ্ছেমতো নয়, কবির ইচ্ছেমতো বেশ অনুগত ভাবনায় বসে যায় পরপর সজ্জিত বাগানের উচ্ছ্বল অরণ্যের মতো আকর্ষনের হন্যে। আহ কী নিবিড়, কী গভীর এ সজ্জা! মানুষের হাতে প্রকৃতির বিভোর প্রেমের মতো পরম গভীর, চরম নিবিড়ভাবে সাজিয়েছেন সালাহউদ্দিন। কারণ তিনি বিশ্ব জয় করতে চান ভালবাসা দিয়ে, মানুষের পাশবতা পরিশুদ্ধ করতে চান নান্দনিকতা দিয়ে :

“ধ্যানে ও জ্ঞানে
মননে ও শরীরে
সময়ে ও সমাজে
ভালোবাসি
ভালোবাসি”। (ভালোবাসি, একত্র অনুভব)

সালাহউদ্দিন আহাম্মদের কবিতার বই দুটো পড়ে মুগ্ধ হলাম। নতুন আঙ্গিকে চিরন্তন ভালবাসার সজল প্রকাশ এবং সলাজ বিকাশ গভীর রাতের নীরব ভাবনা যেন। এমন পরিশ্রুত তমাসন্নতা কার না ভালো লাগে। তাই আমারও ভালো লেগেছে। কয়েকটি মুদ্রণ প্রমাদ ছাড়া আর কোনো ত্রুটি আমার চোখে পড়েনি।প্রমিত বানানে আর একটু সজাগ থাক আবশ্যক। আসলে-
ভালোই লিখেন সালাহউদ্দিন,
প্রেমের দ্রোহে অনল তিনি-
অনাবিল প্রতিদিন। 

[ ব্যস্ততার জন্য বানান দেখতে পারিনি, বানান ভুল থাকলে মন্তব্য কলামে দেবেন,সম্মানিত পাঠক]

Saturday, 6 February 2016

আল মামুনের অণুগল্পে কবিতার বিজয়কেতন / ড. মোহাম্মদ আমীন

এমডি আল মামুন খান, আমার পরিচিত নন, কোনোদিনও দেখিওনি তাঁকে । ফেসবুকে বিভিন্ন জনের ফেস উল্টোতে গিয়ে হঠাৎ চোখে পড়ে যায় একটি
অণুগল্প ‘ ও সেই আপনারে চিনতে পারলে রে’। দুই লাইন পড়ে যখন আর পড়ব না ভাবতে শুরু করলাম, তখনই গল্পের নায়িকা আর ঘটনার অণুপ্রপাত এসে আমাকে পুরোই টেনে নিয়ে গেল গল্পের বিভরে। তারপর শরু কাহিনির এবং কাহিনি শুরু করতে গিয়ে দেখি শেষ হয়ে গেছে। পুরো গল্পটাই আমাকে এত তৃপ্তি দিয়েছে যে, গল্প শেষ হওয়ার পর আর  আরও কিছু জানার আশায় রাজ্যের সব অতৃপ্তি আমাকে ঘিরে ধরে। এমন তৃপ্তিময় অতৃপ্তি আমি আর পাইনি। এটাই আসলে অণুগল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এমন বৈশিষ্ট্য যার গল্পে আছে, তিনি নিশ্চয় একজন ভালো গাল্পিক। তারপর আরও পড়ার আশায় এমডি আল মামুন খান এর ফেসে মগ্ন হয়ে পড়ি এবং মগ্নতার মাঝে হারিয়ে যাই একটু একটু করে পুরোটই।

ফেস, মানে মুখমণ্ডল। কিন্তু তার ফেস শুধু ফেস নয়, গভীর চোখে কবির মুগ্ধতা, কপোলে শিল্পীর মজ্জাগত পুষ্টতায় রসরস মাদকতা, কপোলে ঘামের মাঝে আল মামুন খানের শব্দ আর শব্দের পাখিরা শিশুর মতো এমনভাবে আমাকে লুফে নিল - কিছুই আর মনে থাকল না। আমি হারিয়ে যাই মামুনের মুখে, কপোলে, গণ্ডে আর চোখের বিস্তৃতির অনাগত রহস্যভরা অণুগল্পের অনুতে অনুতে। তাঁর গল্পের ভাষা প্রাঞ্জল এবং নির্ঝর নিপাটে ব্যাকুল মাদকতায় শিরশির
উৎসব। এখানে চমৎকারিত্বে বিদিক দিশা রঙহীন অগণিত রঙের খেলায় ভেসে বেড়ায় মেঘের মতো বিস্ময় হয়ে। কাহিনি চয়নে তাঁর ব্যতিক্রমতা দৃষ্টির অতলান্ত প্রাপ্তি, পরিণতির সঙ্গে শব্দের গাঁথুনি মিলে সৃষ্টি করে অদ্ভুদ মাদকতা। পাঠক হারিয়ে না গিয়ে পারে না লেখকের শব্দের আহ্বানে। দেখুন, আল মামুনের  ‘হলুদপাতার নিঃসঙ্গতা অণুগল্পের একটি অনুলাইন : “ প্রত্যাখ্যাত প্রেমে হলুদ পাতার বর্বিণতায় ভেসে  ভসে, চরম জঘিাংসাকে বুকে নয়িে ভালোবাসার এক পশলা বৃষ্টস্নিাত কোমলতায় ডুবে ডুবে স্বাভাবকি হতে চাইছে এক বষিণ্ন পাতা ঝরার দনি।ে” কবিতার চেয়ে মনোহর, সুরের চেয়ে মুগ্ধকর এ লাইনগুলো দার্শনিক উপলব্ধির প্রকৃষ্ট উদাহরণ। লেখকের মন দর্শনের অন্তরালে আলোড়িত না হলে এমন বাক্য আসে না। প্রতিটি বাক্য যেন গল্পের সমাহারে উথলে পড়া কবিতার বাষ্প।

প্রকৃতি তাঁর লেখার ক্যানভাস, প্রেমরঙে বিচ্ছেদ আর প্রাত্যহিকাতায় মসলায় তিনি গড়ে তুলেন গল্পের প্রাসাদ, স্বপেনর জগত। নাম অণুগল্প কিন্তু পড়ার পর অনুভূতির তীব্রতা ছড়িয়ে পড়ে শরীরের প্রতি কোষে, আদিমতার সারল্যে মন বিকশিত হয়ে উঠে  ভালোলাগার পরশে। অণু ক্রমশ বিশাল হয়ে ধরা দেয় চোখের নেশায়, হৃদয়ের অনুভাষ্যে। তাঁর গল্পে আছে ভালবাসা, ভালবাসায় আছে অুনরাগ আর ওই অনুরাগের ক্ষণ চিন্তাকে কাছেই ভিড়তে দেয় না। রাগ তার অনুরাগের ভেতর ঢুকে এলোমেলো করে দেয় সব পরিকল্পনা, শুধু কল্পনাটাই বেঁচে থাকে সঞ্জীবনী সুরার মতো পরিকল্পনাহীন  প্রেমের অপ্রতিরোধ্য গতি হয়ে : “ এক লখেকরে সাথে লখিতে লখিত,ে এক লখেকিার সর্ম্পক হয়ে গলে। সখোনে ভালোলাগা কি প্রমে কংিবা ভালোবাসা না অন্য কোনো অনুভবহীন অক্ষমতায় পুড়ে যাওয়া অন্য কছিু ছলি, তা জানার প্রয়োজন দখেি না।”

মানুষকে তিনি দেখেন নিজের চোখে কিন্তু নিজের মতো করে। সাধারণত মানুষ অন্যকে দেখে নিজের চোখে অন্যের মতো করে। কিন্তু মামুন দেখেন নিজের চোখে নিজের মতো করে। এখানেই তাঁর দৃষ্টি আর সাধারণ্যের দৃষ্টির পার্থক্য। অন্যের অনুভূতিতে তাঁর গভীর বেদনাবোধ অন্ধবিলাসের কল্পিত মৌকর্ষ। তিনি লিখতে পারেন, প্রকাশ করতে পারেন- অনেকে পারেন না। তাতে কী! তিনি অন্যের ভাবনাগুলো ঠিক চিনে নিতে পারেন এবং নিজের ভাষায় প্রকৃতির মতো সার্বজনীনতায় প্রকাশ করতে পারেন। এটি তার গল্পের বিরল সার্থকতার নিলয় মাধুর্য। মামুনের চেতনা হতে বিকশিত কথারা রবীন্দ্রনাথের মাধুর্যে আধুনিকতার পরশ, দর্শনের গহ্ববের অনুসন্ধানের কৃতিত্ব। তিনি জানেন, ভালবাসাটা এক একজনের কাছে এক একরকম। তাই তার প্রকাশভঙ্গীটাও ভিন্ন। এই ভিন্নতা কী বুঝতে পারা এবং সহজ সরল ভাষায় ছোট পরিসরে ব্যক্ত করতে পারাই গাল্পিকের সবচেয়ে বড় গুণ। এ গুণটা বেশ আলোকিতভাবে আছে জনাব মামুনে। অপরের হৃদয়কে পাঠ করার বিরল গুণ রয়েছে তাঁর। তাই অবলীলায় বলে যেতে পারেন লীলাময় বিবরণ : “হৃদয় বলতে কছিু একটা যে শরীররে ভতের ওর অজান্তে ওকে হৃদয়বতী করে তুলছ.ে.. একটু একটু... পলকে পলক,ে এক গোপন শহিরণ নতুন চররে মত জগেে উঠা হৃদয়রে শুণ্য প্রকোষ্ঠে গড়েে বসছ!ে যা ওকে দোলায়, ভীত কর,ে আবার কাছে টানার মত ভদ্রগোছরে দূরত্ব ও রখেে যায়।”

তাঁর লেখক সত্ত্বা জাগতিক সূত্রের এলেবেলে উৎপল। সাধারণত মানুষ প্রেমের পর লেখক হন, ভালবাসার চড় লেখক হতে বাধ্য করেন কিন্তু ্আল মামুন
উল্টো। লেখক হওয়ার পরই তিনি ভালবাসতে শিখেছেন। এ যেমন দর্শনের স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর দর্শন শেখা। তাঁর নিজের ভাষায়, “ যখন লেখক হলাম একটু আধটু, কবেল ভালোবাসা জন্ম নতিে থাকলো। এর বপিরীতে কনে জানি চাইলওে যতেে পারি না।” এমন অভিজ্ঞতা তাঁকে করেছে আবেগহীন আবেগে ঋদ্ধ। লেখার সময় আবেগকে টেনে ধরে নিজের ইচ্ছেমতো গল্পের লক্ষ্যে ধাবিত করার বিরল গুণ রয়েছে তাঁর। লেখক হওয়ার পর তিনি পুরোই লেখক, ভালবাসায় পুরোটা ভালবাসা এমন মজ্জাগত একাগ্রতা আল মামুনের অণগুল্পের অনুস্বর।

আমি জানি না, কয়জন লেখকে এমন বাঙময় চঞ্চলতা রয়েছে, রয়েছে এমন দিক্সময় পরিপক্কতা। নবীন লেখক হলেও তার অণুগল্পে অনেক পরিপক্কতার ছাপ, এটি বয়সের ছাপ নয়, দক্ষতার নিদর্শন। পড়তে পড়তে আমি অন্য জগতে চলে গিয়েছিলাম - তাঁর গদ্যকে পৃথক করতে পারছিলাম না পদ্য হতে।
তবে পার্থক্য আছে- মামুনের গদ্যে, পদ্যের গভীরতা কিন্তু পদ্যের মতো জটিল নয়, পাঠক সহজে পড়ামাত্র বুঝে নিতে পারেন প্রতিটি অক্ষরের বিন্যাসের প্রতিহাস। তাঁর গল্প কবিতার মতো ছন্দোময় কিন্তু আবেশটা কবিতার চেয়ে ঢের, গানের চেয়ে অভিনব। কারণ এখানে অতৃপ্তির যে নেশা, তা নিটোল প্রেমিকের জোয়ারভাঙা বিরহের চেয়েও প্রবল। তাই মামুনের অণুগল্প কবিতার বিজয় কেতন, সুরের মোহনায় দর্শনের অনুভূতি এবং প্রেমের কোড়কে জীবনের অভিধান। পাঠক আপনার সবকিছু খুঁজে পাবেন এখানে- সব অনুভূতি। তৃপ্ত হবার বিপুল উপাদান রয়েছে এখানে। তার অণুগল্প জীবনবোধের নিটোল অনুভব।