Monday, 22 January 2018

মেথর থেকে প্রফেসর / রাজীব আহমেদ

মেথর থেকে প্রফেসর কথাটি ড. মোহাম্মদ আমীন এর লেখা ‘যেখানেই থাক ভালো থেক গোপাল’ ‍উপন্যাসের সারাংশ। এটি একটি অসাধারণ মানবতাবাদী উপন্যাস এবং মানুষের প্রতি মানুষের বিরল ভালোবাসার একটি হৃদয়গ্রাহী দৃষ্টান্ত। প্রতিনিয়ত অসংখ্য প্রতিভা আমাদের চোখের আড়ালে ঝরে পড়ছে। কার মধ্যে কী প্রতিভা লুকিয়ে আছে জানা যায় না। তাই কাউকে অবহেলা করতে নেই। রাস্তার মধ্যে যে শিশুটি  ভিক্ষা করছে, সে হয়ত সামান্য সুযোগ পেলে হয়ে যেতে পারে অসামান্য কেউ। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত প্রত্যেককে যথাসাধ্য সহায়তা করা। তাহলে পৃথিবী সত্যিকার সাফল্যে মুগ্ধকর ভালোবাসায় সপ্রাণ হয়ে ওঠবে। এবার দেখা যাক, ড. মোহাম্মদ আমীনের লেখা ‘যেখানেই থাক ভালো থেক গোপাল’ বইটির সংক্ষিপ্তসার।


মেথরের শিশুসন্তান গোপাল পিতৃহীন মায়ের নাম প্রভাতি। তিনি সেরাজুল হক নামের এক ধনী লোকের বাড়ির মেথর। প্রভাতির বড়ো ছেলে গাড়ি চাপা পড়ে মারা গিয়েছিল কয়েক বছর আগে। গাড়িতে চাপা পড়ার ভয়ে প্রভাতি গোপালকে গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখে কাজ করেন প্রচণ্ড শীতে গোপাল চিৎকার করে কাঁদে, মশা কামড়ায়। যেখানে বেঁধে রাখা হয় সেখানে মলমূত্র ত্যাগ করে। সেরাজুল হক সাহেবের বাড়ির গৃহশিক্ষক গোপালের দুরবস্থা দেখে মর্মাহত হন। গোপালের কষ্ট তাকে অস্থির করে তোলে। একদিন ভোরে গৃহশিক্ষক শিশু গোপালকে শিকলমুক্ত নিজের রুমে নিয়ে আসেন এরপর থেকে প্রভাতি যতক্ষণ মেথরের কাজ করতেন গোপাল গৃহশিক্ষকের রুমে থাকত গৃহশিক্ষক, গোপালকে পড়াতে শুরু করেন কয়েক মাসের মধ্যে বুঝতে পারেন গোপাল অত্যন্ত মেধাবী। এতে তিনি গোপালের প্রতি আরো উৎসাহিত এবং সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠেন।

গৃহশিক্ষক নিজ উদ্যোগে গোপালকে স্থানীয় নন্দীর হাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি করিয়ে দেন নিজের প্রচণ্ড অভাব সত্ত্বেও গোপালের যাবতীয় খরচ বহন করে  যেতে থাকেন  গোপাল হয়ে ওঠে গৃহশিক্ষকের অতি আদরের একজন। গোপালকে নিজের সন্তানের মতো তার লালন করে যাচ্ছিলেন গৃহশিক্ষক। গোপাল পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি পায়। এতে গৃহশিক্ষক আরো অনুপ্রাণিত হন। সপ্তম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার কয়েক দিন গৃহশিক্ষকের সরকারি চাকরিতে যোগদানের আদেশ আসে। গৃহশিক্ষক চাকরিতে যোগদান করেন কয়েক মাস গোপালের সঙ্গে চিঠিপত্রে যোগাযোগ থাকলেও নানা কারণে ধীরে ধীরে তা বন্ধ হয়ে যায়। শিশু গোপালের ইচ্ছা থাকলেও গৃহশিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ করার কোনো উপায় ছিল না। আস্তে আস্তে গৃহশিক্ষক গোপালের কথা বহুলাংশে বিস্মৃত হয়ে যায়।

 ষোল বছর গৃহশিক্ষক পর জানতে পারেনগোপাল অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পেয়েছিল এসএসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষায়ও সে স্ট্যান্ড করেছিল বর্তমানে আমেরিকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিজ্ঞানের প্রফেসর মেথরের ছেলে গোপাল কীভাবে প্রফেসর হলো তাই এই উপন্যাসের আলেখ্য বইটির প্রকাশক মাওলা ব্রাদার্স।

Sunday, 21 January 2018

বইমেলায় আপনার শিশুর জন্য শ্রেষ্ঠ তিনটি বই / ডা. প্রণব কুমার চৌধুরী

 অমর একুশে গ্রন্থমেলায় অনেক হাজার বই প্রকাশিত হয়। এতগুলি বই থেকে আপনার প্রিয় শিশুকিশোর সন্তানের জন্য অতি কার্যকর ও শিক্ষামূলক বই খুঁজে বের করা কঠিন। হাজার হাজার বই থেকে আপনার শিশু ও কিশোরের অত্যন্ত উপযোগী তিনটা বইয়ে বিবরণ দিলাম। আপনার প্রিয় সন্তানকে আনন্দের সঙ্গে শিক্ষা ও জীবন গড়ার উপাদানে বিভূষিত করার জন্য বই তিনটি অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বইতিনটির লেখক ড. মোহাম্মদ আমীন। প্রকাশক পুথিনিলয়, পাবেন, অমর একুশে গ্রন্থমেলায় পুথিনিলয়-এর স্টলে।
১.    তিনে দুয়ে দশ

ভালোবাসা দিয়ে সবকিছু জয় করা যায়। ভালোবাসা দিয়ে যে কোনো কঠিন হৃদয়কেও বিগলিত করে ফেলা যায়।
ভালোবাসা পেলে যে কোনো দুষ্টমতি শিশুও সুবোধ হয়ে যায় সপ্রাণ চঞ্চলতায়। ভালোবাসা দিয়ে অতি অবাধ্য এবং লেখাপড়ায় প্রচ- অমনোযোগী শিক্ষার্থীর ইচ্ছাকেও প্রতিভায় প্রতিভায় বিকশিত করে তোলা যায়। ভালোবাসায় বারিত করা গেলে অতি বর্বর ব্যক্তিও আদর্শ মানুষে পরিণত হয়। মূলত  এগুলিই উপন্যাসটির বিষয়বস্তু। মা-বাবা, দাদা-দাদি, নানা-নানি, প্রবীণ, সর্ব পর্যায়ের অগ্রজ, বস, শিক্ষক-শিক্ষিকা, সিনিয়র প্রমুখ-সহ যে কোনো গুরুজন, বন্ধু, সহপাঠি, প্রিয়জন ও ভালোবাসার মানুষকে যদি এমন কোনো বিশেষ উপহার দিতে চান, যে উপহার পেলে তিনি খুশি হবেন এবং উপহার দাতার প্রতি তার প্রেম-ভালোবাসা, মায়ামমতা, দয়া-দরদ, স্নেহ-প্রীতি, হার্দিক নৈকট্য, সহানুভূতি, ধৈর্য ও বিবেচনাবোধ বেড়ে যাবে; তাহলে, তাকে ‘তিনে দুয়ে দশ’ উপন্যাস উপহার প্রদানই হবে
ড. মোহাম্মদ আমীন
সবচেয়ে উত্তম এবং কার্যকর। এটি হতে পারে যে কোনো দিবসে যে কোনো অনুষ্ঠানে যে কোনো বয়সের এবং যে কোনো সম্পর্কের প্রিয়জনকে দেওয়া শ্রেষ্ঠ উপহার। বেউ যদি একটি উপন্যাস পড়ে তার শিশু বা জুনিয়রদের নিজের ইচ্ছেমতো গড়ে তোলার কার্যকর কৌশল আয়ত্ত করতে চান তাহলেও বইটি পড়া অপরিহার্য।। এটি এমন একটি বই, যার সারাংশ ফেসবুকে প্রকাশিত হওয়ার পর বোদ্ধামহলে বিপুল সাড়া পড়ে গিয়েছিল। ভাইরাল আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল এর ব্যতিক্রমতার কাহিনি। এটি একটি সর্বজনীন উপন্যাস। বইটি প্রত্যেকের হৃদয়কে নাড়া দিতে সক্ষম হবে। বইটি পড়লে হ্রাস পাবে অস্থিরতা, অধৈর্য এবং মানসিক বিপর্যয়। বইটির অন্তর্নিহিত শিক্ষা লালন করা গেলে যে কেউ অতি উচ্ছৃঙ্খল শিশুসন্তানকেও মনের মতো করে গড়ে তুলতে পারবে।


৪.     ভালোবাসা শুধুই ভালোবাসা

বইয়ের চেয়ে উত্তম উপহার এবং ভালোবাসার চেয়ে শ্রেষ্ঠ কাজ আর নেই। আর এই দুটির সমন্বয় যদি ঘটানো যায় তাহলে যে কারো জীবন হয়ে ওঠে মধুর এবং ভালোবাসাময়। জীবন হয়ে ওঠে স্বর্গীয় প্রাপ্তির চেয়ে আরো বিরল প্রত্যাশিত সুখের অনন্ত উৎস। প্রিয়জন প্রত্যেকের  আছে, প্রত্যেকে চায় তার প্রিয়জন শ্রেষ্ঠ হোক কিন্তু নানা কারণে হয় না; করা যায় না। কিন্তু কেন করা যায় না এবং কীভাবে প্রিয়জনকে প্রত্যাশিত লক্ষ্যে উপনীত করা যায় এবং  এতে
ভালোবাসার ভূমিকাই বা কী তা এই গল্পগ্রন্থের মূল আলেখ্য। প্রত্যেকের চাওয়া-পাওয়া এবং রুচি বা ইচ্ছা ব্যক্তিবিশেষে ভিন্ন। কিন্তু ভালোবাসার ক্ষেত্রে এবং বস্তু হিসেবে বইয়ের ক্ষেত্রে সবার ইচ্ছা অভিন্ন। ভালোবাসা পেলে যে ব্যক্তি খুশি হয় না সে পশুও নয়, জড়; মরা লাশ। বই পেয়ে যে আপ্লুত হয় না, সে লাশের চেয়েও বিরক্তিকর। তবে বই হতে হবে প্রিয়জনের মনকে নাড়া দেওয়ার মতো। ভালোবাসা শুধুই ভালোবাসা এমন একটি বই। এটি যে কোনো বয়সের এবং যে কোনো পর্যায়ের প্রিয়জনকে উপহার দেওয়া যায়। এটি এমন একটি বই যা প্রিয়জনকে দিলে আপনার প্রতি শুধু ভালোবাসা নয়, গভীর কৃতজ্ঞতার  নিবিড় আবেশে বেড়ে যাবে পারস্পরিক প্রীতি। ভালোবাসার মূল্য কী এবং কীভাবে, কোথায় কাকে ভালোবাস দিতে  হয় এবং কীভাবে তা স্থায়ী করা যায়- তা এই গল্পগ্রন্থের পাত্রপাত্রীদের আচরণ, কথোপকথন এবং কাহিনি বিন্যাসে মেলে ধরা হয়েছে। জীবন ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে অর্জিত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সহজ-সরল ভাষায় পরিবেশিত বইদুটি হতে পারে ভালোবাসা দিবস-সহ যে কোনো দিবসে যে কোনো অনুষ্ঠানে যে কোনো বয়সের এবং যে কোনো সম্পর্কের  প্রিয়জনকে দেওয়া আপনার শ্রেষ্ঠ উপহার।

 ২.     বড়ো হুজুর ও বরুমতির মেলা

শিশুকিশোর হতে যুবক-যুবতী এবং পরিণত বয়স্ক Ñ এককথায় সবার উপযোগী এই উপন্যাসটি একদিকে যেমন হৃদয়
বিদারক  অন্যদিকে তেমনি প্রত্যশার বিরল স্নিগ্ধতা আর ভালোবাসা ও কাঠিন্যের বৈচিত্র্যময় উপমায় ভরপুর এক অতুলনীয় কিশোর উপন্যাস। বড়ো হুজুর, বরুমতি এবং বড়ো হুজুরের শিশু নাতিকে নিয়ে উপন্যাসটি রচিত। বরুমতি  কোনো মেয়ে নয়। একটি  খাল। বরুমতির তীরে প্রতিবছর চৈত্রসংক্রান্তিতে একদিনের জন্য হিন্দুদের মেলা বসত।  অনেক শিশুকিশোর  বরুমতির মেলায় যেত।  কিন্তু বড়ো হুজুর তার নাতিকে যেতে দিতেন না। ঘরে আটকে রাখতেন। বড়ো হুজুর তার শিশু নাতির মেলায় যাওয়া রোধ করার জন্য কত নৃশংস হয়ে উঠতেন এবং কী জঘন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতেন, অপরদিকে শিশুটি মেলায় যাওয়ার জন্য কী করতেন তার শোকাবহ ভাষাচিত্র বইটির মূল বিষয়বস্তু। এত গোঁড়া হওয়া সত্ত্বেও বড়ো হুজুর কত দেশপ্রেমিক এবং কীরূপ সমাজ সচেতন ছিলেন সেই বিষয়টিও উপন্যাসটিতে উঠে এসেছে।  উপন্যাসটি তৎকালীন ধর্মীয় গোঁড়ামির নির্যাতনে পিষ্ঠ এক অসহায় শিশুর জীবনচরিতের একটি করুণ চিত্র। যে কারুণ্য আবার নির্যাতনকারীর স্নেহে অমিয় হয়ে উঠত হার্দিক মমতার পারিবারিক পরশে।  এটি শুধু উপন্যাস নয়, যেন কালের পরিক্রমায় চলে আসা একটি জীবন্ত জীবনবন্দনা। যার গুরুত্ব ইতিহাসের চেয়েও অধিক। বইটি আপনার সংগ্রহকে করবে সমৃদ্ধ এবং চিন্তাকে করবে ঋদ্ধ।









Thursday, 4 January 2018

নোবেল সাহিত্য পুরস্কার ১৯০১-২০১৭ গ্রন্থ আলোচনা / ড. অমিত কুমার কুণ্ড


বলা যায়, সৌভাগ্যবশত ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশের ড. মোহাম্মদ আমীনের লেখা একটা বই আমার হাতে পড়ে।
বইটির নাম  ‘নোবেল সাহিত্য পুরস্কার ১৯০১-২০১১’, প্রকাশক আগামী প্রকাশনী, বাংলাবাজার, ঢাকা। ঢাকার বই আমরা বেশি একটা পাই না। যেগুলি পাই সেগুলি খ্যাতিমান লেখকের কিন্তু মানসম্মত নয়। সাধারণত বাংলাদেশের খ্যাতিমান লেখকদের  লেখা মানস্মত হয় না। এটি আমার ধারণা। ভিন্নমত থাকতে পারে।বাংলাদেশের অধিকাংশ খ্যাতিমান লেখক কুম্ভীলক নামে পরিচিত। যাই হোক, ড. মোহাম্মদ আমীনের  এই বইটি পড়ে আমি অভিভূত হলাম। অভিভূত হলাম এই কারণে যে, তিনি এখানে এমন কিছু তথ্য দিয়েছেন, যা বাংলা ভাষায় লেখা  অন্য কোনো বইয়ে  আমি  পাইনি। অধিকন্তু ১৯০১ থেকে ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত  যেসব লেখক, সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেছেন, তাদের সাহিত্যকর্ম-সহ নানা বিষয়ে বৈচিত্র্যম বর্ণনা বইটিতে রয়েছে। মুগ্ধ হয়ে আমি লেখক ড. মোহাম্মদ আমীনকে একটা পত্র দিয়েছিলাম । এরপর হতের তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্ক। আস্তে আস্তে যা বন্ধুত্বে গড়ায়।

মাস কয়েক আগে জানতে পারলাম, ড. মোহাম্মদ আমীন বইটিকে পরিবর্ধন ও পরিমার্জন করে ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিকদের  অন্তর্ভুক্ত করে ‘নোবেল সাহিত্য পুরস্কার ১৯০১-২০১৭’ নামের একটি পাণ্ডুলিপি তৈরি
ড. মোহাম্মদ আমীন
করেছেন।আমি পাণ্ডুলিপি পাঠানোর অনুরোধ করলে লেখক দ্বিধা না করে পাঠিয়ে দিলেন।  পাণ্ডুলিপি পড়ে আমি আবার মুগ্ধ হলাম। মুগ্ধ হলাম এজন্যই যে, এই গ্রন্থে নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিকদের জীবনী এমন কিছু তথ্য-সহ পরিবেশন করা হয়েছে, যাতে  যে কোনো স্তরের পাঠক মনকে আকৃষ্ট করার মতো পর্যাপ্ত উপাদান রয়েছে।  ১৯০১ খ্রিষ্টাব্দ হতে নোবেল পুরস্কার প্রদান শুরু হয়। তখন থেকে ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত যেসব ব্যক্তি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তাদের সাহিত্যকর্ম, জীবনী, জীবন-জীবিকার নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, সংসার জীবন, পারিবারিক বলয়, রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্র প্রভৃতি এই গ্রন্থে সহজ সরল ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে। আমি মনে করি, সাধারণ পাঠক, বোদ্ধা, পেশাজীবী, ছাত্র-শিক্ষক, রাজনীতিক, গবেষক এবং বিসিএস-সহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের জন্য ‘নোবেল সাহিত্য পুরস্কার (১৯০১-২০১৭)’  বইটি অত্যন্ত কার্যকর সংগ্রহ হিসেবে বিবেচিত হবে।

লেখকের কাছ  থেকে জানতে পারি বইটি এবার আগামী প্রকাশনী থেকে নয়,  বাংলাদেশের শিখা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হচ্ছে এবং অমর একুশে গ্রন্থমেলায় শিখা প্রকাশনীর স্টলে বইটি পাওয়া যাবে।

লেখক  পরিচিতি :  শিক্ষাবিদ, গবেষক। ভারতীয় বংশোদ্ভুদ ব্রিটিশ।

Tuesday, 2 January 2018

সুভাষ সর্ব্ববিদ্যা : কাব্যে-গল্পে অভিজ্ঞতার নির্ঝর প্রসর / ড. মোহাম্মদ আমীন

সুভাষ সর্ব্ববিদ্যা : কাব্যে-গল্পে অভিজ্ঞতার নির্ঝর প্রসর

(খসড়া)

ফেসবুকে বিভিন্ন জনের আইডি উল্টোতে গিয়ে হঠাৎ চোখে পড়ে যায় সুভাষ সর্ব্ববিদ্যার আইডি। ইচ্ছা ছিল একটু
দেখে অন্য কারো আইডিতে চলে যাব। কিন্তু একটা স্ট্যটাস পড়ার পর আর একটা পড়ার ইচ্ছা প্রবল হয়ে উঠল। এভাবে পড়ার ইচ্ছা ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছিল। লেখা নয়, জন্য রোমাঞ্চিত হওয়ার মতো কিছু জীবনালেখ্য। কবিতার পর গল্প, গল্পের পর আবার কবিতা এভাবে সজ্জিত ফেসবুক আমাকে ধীরে ধীরে আকৃষ্ট করে তুলছিল।  মোহময় করে তুলছিল তমার উপস্থিতি, তমার নির্মাল্য। বিভ্রান্ত করে দিচ্ছিল গল্পের অনুভবে নিবিড়-মজ্জায় ঝড় তোলা জীবন্তিকা। সুভাষ সর্ব্ববিদ্যার লেখা কোনো কল্পমাত্র নয়, বাস্তবতার জীবন্ত বিন্যাস, অভিজ্ঞতার মর্মর নির্যাস। সর্ব্ববিদ্যার আইডি আমাকে এত তৃপ্তি দিয়েছে যে, শেষ হওয়ার পর আরও কিছু জানার আশায় রাজ্যের সব অতৃপ্তি ঘিরে ধরে। এটাই আসলে শিল্পসম্মত লেখার বৈশিষ্ট্য। এমন বৈশিষ্ট্য যার  লেখায় আছে, তিনি নিশ্চয় ভালো লেখক। সুভাষ সর্ব্ববিদ্যা একজন ভালো লেখক।
  
মূলত তিনি গল্পকার। তবে কবিতাতেও সমান দক্ষ। প্রথম তাঁর যে বইটি আমি পড়ি সেটি ‘বিদীর্ণ বালুচর ও অন্যান্য’। চোরাটান, বিদীর্ণ বালুচর, হাশেম আলী মাস্টার, ফ্রেমে বন্দি ছবি, বুবানি, দুর্মতি এবং আলো-ছায়া ও একটি ঘুণপোকা- এ ছয়টি ছোটগল্প নিয়ে গ্রন্থটির অবয়ব। জীবনের তিলতিল অনুভব থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতার সমন্বিত প্রকাশ গল্পগুলোকে অসাধারণ করে তুলেছে। এ শুধু গল্প নয়, প্রাত্যহিক জীবনের বাস্তব রূপায়ণে কর্মজীবনের সান্নিধ্য সোহাগÑ কষ্টের বিমূর্ত সোহাগে গড়ে ওঠা জীবনবৃক্ষের অপরাজেয় গল্প। পড়া শুরু করলে না-শেষ করে ছাড়া যায় না। 

এমন জীবনধর্মী গ্রন্থ, পাঠকের অনুভবকে শাণিত করে তুলতে পারে জীবনবোধের পূর্ণ-মহিমায়। গ্রন্থের প্রচ্ছদটাও হয়েছে চমৎকার। তবে লেখাগুলোর ফন্ট স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা ছোট করায় আমাদের মতো বুড়োদের পড়তে কষ্ট
সুভাষ সর্ব্ববিদ্যার গল্পগ্রন্থ
হয়। হয়তো খরচ কমানোর জন্য এমনটি করা হয়েছে। ‘বিদীর্ণ বালুচর ও অন্যান্য’ বাংলা সাহিত্যের ছোটগল্প-সম্ভারে একটি অনবদ্য সংযোজন। সুভাষের গল্প জীর্ণ জীবনের ভিন্নকথার লাল জুঁই। রক্তগুলি এখানে বিকট উর্মীতে জীমুত হয়ে আকাশে ছুটে যায়। লাইনে লাইনে কষ্টকর মুগ্ধতা, শিল্পীর মজ্জাগত পুষ্টতায় রসরস মাদকতা এবং শ্রমঘামের মাঝে শব্দ আর শব্দের পাখিরা শিশুর মতো অর্থহীন অর্থে অবিরাম গেয়ে যায় কিচির মিচির। তাঁর গল্পের ভাষা প্রাঞ্জল এবং নির্ঝর নিপাটে ব্যাকুল মাদকতায় শিরশির উৎসব। প্রতিটি বাক্য সহজবোধ্য, সরল এবং অকপট। এখানে চমৎকারিত্বের বিদিক দিশা রঙহীন অগণিত রঙের খেলায় ভেসে বেড়ায় মেঘের মতো বিস্ময় হয়ে বুকের কষ্টে মনের যাতনায়।

কবিতায় শব্দ চয়নে সুভাষের ব্যতিক্রমতা দৃষ্টির পরে আরও দৃষ্টির উপলব্ধক প্রাপ্তি। এ এক অনবদ্য অনুভব, পরিণতির সঙ্গে শব্দের গাঁথুনি মিলে সৃষ্টি করে অদ্ভুদ মাদকতা। পাঠক হারিয়ে না গিয়ে পারে না শব্দের আহ্বানে। দেখুন, কীভাবে তিনি তুলে ধরেছেন জীবনকে সমাহিত বিচূর্ণতায় :
“তোমার মায়াবী ঠোঁটের উষ্ণ চুম্বন
আগুনের ইতিহাস খুঁজে।
তোমার পত্র লেখা শুধরে দেবার সুবোধ স্যার এখন আর নেই।
-----
তমা,এখনও কি তুমি শুনতে পাও 
শরতের শিউলি ঝরা গান?” 

 লাইনগুলি সুভাষের কবিতার কিন্তু কবিতার চেয়েও মনোহর, কষ্টের চেয়ে বিধুর, সুরের চেয়ে মুগ্ধকর, উপলব্ধির চেয়েও বাস্তব এবং অনুভবের চেয়েও  রোমাঞ্চকর। কবির মন দর্শনের অন্তরালে আলোড়িত না হলে, সুকুমারচিত্ত কৌমার্যের উন্মাদনায় নিয়মের রশি ছিঁড়ে বের হওয়ার প্রয়াস নিয়মহীন নিয়মের মতো গর্জে না উঠলে এমন বাক্য আসে না। প্রতিটি বাক্য যেন অভিজ্ঞতার সমাহারে উথলে পড়া আবেগের লালায়িত বাষ্প। কষ্টগুলিকেও তিনি মিষ্টতার আবরণে উপভোগ্য করে তুলেন নিখাদ অভিমানে : 
তুমি আসবে ভেবে
চাঁপা বনে যাইনি।
কলঙ্কিনী চাঁদ কি
সবুজাভ হয়েছিল?” [সুভাষ সর্ব্ববিদ্যা]

সুভাষ সর্ব্ববিদ্যা সুভাসিত ভূষণে বিভুষিত সাধারণ জীবনের একজন অসাধারণ মানুষ। সহজসরল এবং অমায়িকতা তার মজ্জাগত বৈশিষ্ট্য। মুখ থেকে বের হয়ে আসা নরম শব্দের পরম আতিথেয়তা মুহূর্তে রাশি রাশি ¯েœহ হয়ে টেনে
নিতে পারে অপরিচিত যে কাউকে। অল্প পরিচয়েও সে আমার প্রিয় একজন। অবশ্য, প্রিয় হতে সময় নয়, মনোবৃত্তিক ঔদার্যের প্রয়োজন। এটি তার পুরোপুরি রয়েছে। সুভাষ লিখেন কষ্ট নিয়ে। মানুষের কষ্ট, বোধের কষ্ট, জীবনের কষ্ট, মরণের কষ্ট, সুখের কষ্ট শান্তির কষ্ট। তাঁর দৃষ্টি সাধারণ কোনো দৃষ্টি নয়, দার্শনিক আলোর অসীম দৃষ্টি। তাই সুখেরও যে কষ্ট আছে তা-ও তিনি দেখতে পান। বৃষ্টির শব্দে তিনি কান পাতেন না শুধু, নাকও পাতেন ঘ্রাণ নিতে। তাঁর ‘বৃষ্টির ঘ্রাণ’ গল্পে এটি বিমূর্ত। কবিতায় তিনি অদম্য। ছোটো ছোটো লাইনে সহজ শব্দগুলি জীবনের জটিল মুহূর্তগুলিকেও সাগরের ফেনিল বিশালতায় নিমজ্জিত করে দেন। কষ্টকেও তিনি তাই ভোগ করতে পারেন সুখের প্রশান্ত মাদকতায়। নিজেকেও বাদ দেন না, তীক্ষ্মনাগ্র তীরের ফলা দিয়ে ফলা ফলা করে দেন : 
“স্বার্থপরের সুমার হলে
                                   ‘নামটা আমার আগে দিও। [ সুভাষ সর্ব্ববিদ্যা]

জীবনের নানা ঘাতপ্রতিঘাত তাঁর গল্পকবিতার রক্তমাংস এবং প্রতিনিয়ত অর্জিত অভিজ্ঞতা এর নিঃশ্বাস। তাই যত কষ্ট আসুক, যতই বিপন্নতায় মুষড়ে পড়–ক, তিনি অকুতোভয় নেই। তিনি প্রেমের বাগে, বাঘের কাঁধে ছুটে বেড়াতে পারেন সখীর কৃষ্ণরৌপ্যের সন্ধানে। অন্তদর্শনে সুভাষ অতুলনীয়। কেবল ভিতর-বাহির নয়, এ দুটির ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়াও তাঁর চোখ এড়ায় না। কোনো ফাঁক না রেখে দ্বিধাহীন বলে যান : 
                           “বৈচিত্র্যময় মানব জীবন বাইরে থেকে পরিলক্ষিত হয়না তবুও সে প্রাণবন্ত। পুষে রাখে কষ্ট                                      যন্ত্রনা। এরপর....অনেক কথা হলো। শৈশব  কৈশোর যৌবন....। আজ দেখে এলাম তার,                                          সুখের কালশিটা!” 

এমন আবেগময় বাক্যগুলি পড়লে  মনে হয়, আমাদের দৃষ্টি তার দৃষ্টি হতে অনেক পিছিয়ে। দুঃখের সঙ্গে আজন্ম সান্নিধ্য তাঁকে দুঃখের রাজ্যে সুখের অভিবাসন গড়ে দিয়েছে। তাই শত কষ্টও সুভাষকে ভাঙতে পারে না বরং কষ্টকে উপহাস করে দিব্যি এগিয়ে যান। কষ্টকে প্রশ্নের উদরে ঢুকিয়ে তিনি নিয়ে আসেন ফুটফুটে শিশু। নিজের দুর্ভাগ্যকে সৌভাগের নায়ে ভাসিয়ে প্রশ্ন করে বসেন ভগবানকে :

         “-- ভাগ্যবানের বোঝা নাকি ভগবান বয়।
             তমা, ও তমা,
            তুমি কি জানো- দুর্ভাগার বোঝা কে বয়?” 
প্রকৃতি আর জীবনের বাস্তবতা সুভাষ সর্ব্ববিদ্যাল লেখার ক্যানভাস, প্রেমরঙে বিচ্ছেদ আর প্রাত্যহিকাতায় মসলায় তিনি গড়ে তুলেন গল্পের প্রাসাদ, স্বপনের জগতৎ, সুড়কি তার কষ্ট। সুভাষের গল্পগুলি পড়ার পর অনুভূতির তীব্রতা ছড়িয়ে পড়ে শরীরের প্রতি কোষে, বিষ্ফোরণ ঘটনায় আনবিক বোমার মতো। দিব্যদর্শনে মন বিকশিত হয়ে ওঠে  ভালোলাগার পরশে। জীবনের কষ্টগুলি গল্পের  বাক্যে ক্রমশ বিশাল হয়ে ধরা দেয় চোখের নেশায় এবং হৃদয়ের অনুভাষ্যে। তাঁর গল্পে আছে ভালোবাসা, ভালবাসায় আছে অুনরাগ আর ওই অনুরাগের ক্ষণ চিহ্নকে কাছেই ভিড়তে দেয় না অতৃপ্তির অবরোধে। তাই কষ্টতেও তাঁর অতৃপ্তি নেই। জীবনের চেয়ে তৃপ্তি আর কী আছে! তার কোনো কিছুতে পরোয়া নেই :
                  “স্থির বিদ্যুতের মতো
                   জমে আছে বুকের এক ধার।
                  তবুও জীবন চলে
                 নির্ভীক বাধাহীন দূর্বার।”

রাগ তাঁর অনুরাগের ভেতর এবং সুখ তার কষ্টের ভিতর ঢুকে এলোমেলো করে দেয় সব পরিকল্পনা, শুধু কল্পনাটাই বেঁচে থাকে সঞ্জীবনী সুরার মতো পরিকল্পনাহীন  প্রেমের অপ্রতিরোধ্য গতি হয়ে। 

মানুষকে তিনি দেখেন নিজের চোখে কিন্তু নিজের মতো করে নয়, প্রত্যেকের মতো করে। এভাবে দেখার জন্য যে চোখ, যে দৃষ্টি এবং যে ধৈর্য ও অন্তর প্রয়োজন সবকিছু তার আছে। সাধারণত মানুষ অন্যকে দেখে নিজের চোখে অন্যের
হায়াৎ মামুদ ও সুভাষ সর্ব্ববিদ্যা
মতো করে। কিন্তু সুভাষ দেখেন নিজের চোখে নিজের মতো করে প্রত্যেকের চেতনার রসে সিক্ত হয়ে অনুভবের নীহারিকায়। এখানেই তাঁর দৃষ্টি আর সাধারণ্যের দৃষ্টির পার্থক্য। অন্যের অনুভূতিতে তাঁর গভীর বেদনাবোধ অন্ধবিলাসের কল্পিত কৌমার্য। তিনি লিখতে পারেন, প্রকাশ করতে পারেন- অনেকে পারেন না। তাতে কী! তিনি অন্যের ভাবনাগুলি ঠিক চিনে নিতে পারেন এবং নিজের ভাষায় প্রকৃতির মতো সার্বজনীনতায় প্রকাশ করতে পারেন। এটি তার গল্পের বিরল সার্থকতার নিলয় মাধুর্য। সুভাষের চেতনা হতে বিকশিত কথামালা রবীন্দ্রনাথের মাধুর্যে আধুনিকতার পরশ, দর্শনের গহ্ববের অনুসন্ধানের কৃতিত্ব। তিনি জানেন, ভালোবাসাটা এক একজনের কাছে এক একরকম। তাই তার প্রকাশভঙ্গীটাও ভিন্ন। এই ভিন্নতা কী বুঝতে পারা এবং সহজ সরল ভাষায়  ছোটো পরিসরে ব্যক্ত করতে পারাই গাল্পিকের সবচেয়ে বড়ো গুণ। এ গুণটা বেশ আলোকিতভাবে আছে জনাব মামুনে। অপরের হৃদয়কে পাঠ করার বিরল গুণ রয়েছে তাঁর। তাই অবলীলায় বলতে পারেন লীলাময় বিবরণ :

                       “কিছু অভিমান। কিছু কষ্ট। এর থেকে বেরিয়ে আসছে কেউ কেউ। কেউ বা বেরিয়ে এসে জয়ী                                  হয় অর্হনিশ। কেউবা হারায়ও। ঐ হারুয়াদের দলে নতুন নাম তুলেছি এই আমি। কারণ-আমি                                  হারতে জানি। হারতে শিখেছিলাম সেই কৈশোর বেলায়,আমার চিরদুঃখীনি মা'র কাছে। সেই                                   সময়  উদ্বেলিত হতাম হেরে যাওয়ার আনন্দে।”

সুভাষের লেখক সত্ত্বা জাগতিক সূত্রের এলেবেলে ঝিলে ভেসে ভেসে নেচে বেড়ানো উৎপল, তবে এই উৎপল কণ্টকাচ্ছাদিত। সাধারণত মানুষ প্রেমের পর লেখক হন, ভালোবাসার চড় লেখক হতে বাধ্য করে কিন্তু সুভাষ উল্টো। লেখক হওয়ার পরই তিনি ভালোবাসতে শিখেছেন। তার ভালোবাসা শুধ মানুষ নয়, কষ্টরাও তার ভালোবাসা পাত্র। কষ্টে কষ্টে তার চেতনা হয়েছে ঘাতসহ। এমন অভিজ্ঞতা তাঁকে করেছে আবেগহীন আবেগে ঋদ্ধ। অন্যদিকে আত্মবিশ্বাসী ও পরিসুদ্ধ। লেখার সময় আবেগকে টেনে ধরে নিজের ইচ্ছেমতো গল্পকে গল্পের লক্ষ্যে ধাবিত করার বিরল গুণ রয়েছে তাঁর। লেখক হওয়ার পর তিনি পুরোই লেখক, ভালোবাসায় পুরোটা ভালোবাসা এমন মজ্জাগত একাগ্রতা সুভাষের গল্পের স্বভাবগত মাধুর্য  : 

              “কোন নৈঃশব্দ রাতে স্তব্ধতার বুক চিরে
                বেরিয়ে আসে, এক অভিশপ্ত জীবনের গল্প।
              ঐ মুহুর্তে এক আনাড়ি লেখক দর্শক হয়। খুঁজে ফিরে
              জীবনের স্পন্দন ! [ সুভাষ সর্ব্ববিদ্যা]।

কয়জন লেখকে এমন বাঙময় চঞ্চলতা রয়েছে, রয়েছে এমন  বৈচিত্র্যময় তারল্য। যেভাবে চিন্তা করা যায়, যেভাবে
সুভাষ সর্ব্ববিদ্যা, শামসুদ্দিন শিশির, হায়াৎ মামুদ, ড. মোহাম্মদ আমীন
টানা যায় সেভাবে করা যায়। অনুভবের এমন বহুমুখীনতা  লেখার বিরল সৌন্দর্য। নবীন লেখক হলেও তার গল্পে অনেক পরিপক্কতার ছাপ, এটি বয়সের ছাপ নয়, দক্ষতার নিদর্শন। পড়তে পড়তে অন্য জগতে চলে যেতে হয়।  তাঁর গদ্যকে পৃথক করা যায় না কবিতা হতে। তবে পার্থক্য আছে। তাঁর গদ্যে পদ্যের গভীরতা আছে কিন্তু পদ্যের মতো জটিল নয়, পাঠক সহজে পড়ামাত্র বুঝে নিতে পারেন প্রতিটি অক্ষরের বিন্যাসের প্রতিবিন্যাস। তাঁর গল্প কবিতার মতো ছন্দোময় কিন্তু আবেশটা কবিতার চেয়ে ঢের কোমল এবং গানের চেয়ে অভিনব। কারণ এখানে অতৃপ্তির যে নেশা, তা নিটোল প্রেমিকের জোয়ারভাঙা বিরহের চেয়েও প্রবল। তাই সুভাষের গল্প কবিতার বিজয় কেতন, সুরের মোহনায় দর্শনের অনুভূতি এবং প্রেমের নিসপিস কম্পনে  জীবনের অভিধান। প্রকৃতিকেও তিনি তার প্রেম আর জীবন-জীবিকার প্রাপ্তি অপ্রাপ্তিতে ডেকে আনেন সাদরে :

              “সেদিন ছিল পোয়াতি জ্যোস্না
               কী এক অজানা আবেশে
               জড়িয়ে ধরলে তুমি, ঠাঁই নিলে 
              আমার বিদীর্ণ বুকে। 
             সেদিন  পোয়াতি জ্যোৎস্নাও স্বাক্ষী ছিল।” 
যতই কষ্ট থাকুক জীবনে, যতই অপ্রাপ্তি থাকুক দিবনদে, যতই হাহাকার থাকুক তমরার গলায়, তবু সুভাষ সুভাষিত তার জীবনবোধের নন্দিতে। তাই সব ছাপিয়ে উজাড় হয়ে ওঠে তার কণ্ঠ নবজাতকের মতো নবকোরকের স্বপ্নীল প্রাতে  প্রশ্নাতীত লাস্যে : 
               “তুমি আমার একটা দিনের দিবস নও মা। ৩৬৫টি দিনই এক একটি দিবস। সারাদিনের ক্লান্তি শেষে                        যখন  ঘরে ফিরি। তোমার কষ্ট মাখা মুখে ফুটে উঠে এক চিলতে হাসি। আর ওই হাসিই আমার যাপিত                     জীবনের  এক  সমুদ্র সুখ। মুহুর্তে আমি ভুলে যাই আমার অতীত বর্তমান সবকিছু সবকিছু।”

শুধু গল্পে নয়, কবিতাতেও তার একই প্রার্থনা, একই সুর ধ্বনিত হয় সহাস্য কষ্টের আনন্দমাল্যে। যা দিয়ে কবি, তাঁর পাঠককে এটাই শেখাতে চাইছেন যে, জীবনের চেয়ে বড়ো উপহার আর হতে পারে না। জীবনের তুলনায় কষ্ট সমুদ্রের তুলনায় এক বিন্দু জলের চেয়েও নগণ্য। অতএব কেন, আমাদের আকুতি থাকবে, কেন থাকবে প্রাপ্তির কান্না। এ তো জীবনকে আরো কষ্টময় করে তুলবে। সুতরা অপ্রাপ্তি ভুলে প্রাপ্তি মগ্ন হবো প্রেমের শীৎকারে। ভালোবাসায় ফেলে সব কষ্ট আর অপ্রাপ্তিকে শেষ করে দেব।
“একেতো বিদ্যুতের ভেল্কিবাজি
তার 'পরে অসহ্য গরম
তবু ও কমতি নেই
ভাই -বোনের অটুট বন্ধন..।

Friday, 22 December 2017

মেয়ে গৃহকর্মী ওসি এবং স্ত্রী রিভিউ / শ্রাবন্তনাহা অথৈ

মেয়ে গৃহকর্মী ওসি এবং স্ত্রী  ড. মোহাম্মদ আমীনের লেখা ভালোবাসা শুধুই ভালোবাসা গল্পগ্রন্থের একটি গল্প। গল্প কতো জীবন্ত, বাস্তব
এবং হৃদয়গ্রাহী হতে পারে তা এই গ্রন্থটি না পড়লে বোঝা যাবে না। সৌভাগ্যবশত আমি এই গল্পগ্রন্থের পাণ্ডুলিপিটা একবার পড়ার সুযোগ পেয়েছি। এজন্য প্রমিতার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। কোনো  লেখকের বই প্রকাশের আগে পাণ্ডুলিপি ছুঁয়ে দেখতে পারা এবং লেখকের কাছ থেকে পাওয়া পাণ্ডুলিপি পড়তে পারার বিরল অনুভূতির সঙ্গে যদি বইয়ের অসাধারণত্ব যুক্ত হয় তাহলে সেটি জীবনের অবিস্মরণীয় ঘটনা হয়ে ওঠে। আমি এমন অবিস্মরণীয় ঘটনার স্বাদ পেয়েছি।
ভালোবাসা শুধুই ভালোবা গল্পের প্রত্যেকটি গল্প ইতিহাসের মতো জীবন্ত। লেখকের জীবনের বাস্তব ঘটনা নিয়ে অনবদ্য সাহিত্যমগ্ন উপস্থাপনা পাঠকে শুধু আনন্দই দেবে না, লেখকের সঙ্গে একীভূত করে দেবে জীবনের চাওয়াপাওয়া, টানাপোড়েন আর হাসি-কান্নার আনন্দবিধুর সমাসন্নতায়। এমন বই আমি পড়িনি। এটি আমার কোনো বাহুল্যাক্তি নয়, অনুভবের নিবিড় অভিজ্ঞতা। মানুষকে মননশীল হতে হলে সাহিত্যকর্ম অধ্যয়ন কত আবশ্যক তা এই গ্রন্থটি পড়লে বুঝতে পারবেন।
বইটির প্রকাশক পুথিনিলয়, প্রচ্ছদ করেছেন মামুন হোসাইন, দাম ১২০ টাকা। বইটি আগামী অমর একুশে গ্রন্থমেলার (২০১৮) পুথিনিলয়ের স্টল থেকে সংগ্রহ করে নিতে পারেন। এখানে গল্পগ্রন্থটির একটি গল্প দেওয়া হলো। এটি লেখক তার ফেসবুকে প্রচার করেছেন। আশা করি ভালো লাগবে। আমি নিঃসন্দেহে বলতে পারি, এই বইটি আপনার সংগ্রহশালাকে সমৃদ্ধ করবে। আপনাকে করবে আনন্দ আর প্রত্যয়দৃষ্টে নির্ভরশীল ও সাহসী। তাহলে পড়ে দেখি গল্পটি :

মেয়ে গৃহকর্মী ওসি এবং স্ত্রী  রিভিউ


২০০১ খ্রিষ্টাব্দের কথা।
আমি তখন যশোর জেলার অভয়নগর উপজেলার ইউএনও।ইউএনও হিসেবে এটি আমর দ্বিতীয় পদায়ন। এর আগে ছিলাম শরীয়তপুর জেলার ভেদরগঞ্জের ইউএনও।
সৌজন্য সাক্ষাতে এসেছেন অভয়নগর থানায় সদস্য যোগ-দেওয়া ওসি। সঙ্গে সেকেন্ড অফিসার। পিয়ন মালেক তাদের ড্রয়িং রুমে
ড. মোহাম্মদ আমীন
বসতে দিলেন। আমি তখন দোতালায় ঘুমোচ্ছিলাম।
ওসি মানে অফিসার ইনচার্জ। মর্যাদায় পুলিশ পরিদর্শক।উপজেলার জবরদস্ত অফিসার। তাকে খাতির করেন না এমন অফিসার নেই। শুধু অফিসার কেন, রাজনীতিক নেতারাও খাতির করেন। উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে খাতির না-করলেও চলে কিন্তু ওসিকে খাতির না-করে উপায় নেই। যার লাঠি তার মাটি। লাঠির জন্ম হয়েছে মাটি দখলের জন্য।
ওসি সাহেব ড্রয়িং রুমে বসে আমার জন্য অপেক্ষা করছেন।বারান্দায় একজন মেয়ে হাঁটছে।ওসি সাহেব মেয়েটিকে বললেন : মা একটু এদিকে এস তো।
এগিয়ে আসে মেয়েটি : কিছু বলবেন?
: এক গ্লাস পানি দাও। 
মেয়েটির ইশারা পেয়ে পিয়ন মালেক এক গ্লাস পানি দিয়ে গেলেন। 
ওসি সাহেব, দারোগাকে বললেন : ইউএনও স্যারের মেয়েটি বেশ সুন্দর। 
আরও কিছুক্ষণ কেটে যায়।এখন মেয়েটি বারান্দায় কাপড় নাড়ছে। ঘড়ি দেখলেন ওসি সাহেব। অফিসে অনেক কাজ। তাড়াতাড়ি যেতে হবে।
মেয়েটিকে আবার ডাক দিলেন ওসি সাহেব : মা, তোমার আব্বুকে আমার খবর দিয়েছ?
মেয়েটি কিছু না বলে উপরে চলে যায়। ওসি সাহেবের আগমনবার্তা জানার কয়েক মিনিট পর নিচে নামলাম।
সালাম দিয়ে হ্যান্ডসেকের জন্য হাতি বাড়িয়ে দিলেন ওসি সাহেব। 
দুজন উপজেলার হর্তা-কর্তা।ওসির হাতে লাঠি, আমার হাতে তাজ। তবে লাঠির ক্ষমতা তাজের চেয়ে বেশি। দুজনের বনিবনা না হলে উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে অপদস্থ হতে হয়। তাজ দিয়ে কাউকে পেটানো যায় না। কিন্তু লাঠি দিয়ে তাজ কেন, মাথা পর্যন্ত ফাটিয়ে দেওয়া যায়। তাই সর্বত্র লাঠির জয়। 
হ্যান্ডস্যাকের পর শুরু হলো গল্প- চাকরি, দেশ, উপজেলা- - - সংসার
ওসি সাহেব বললেন : আপনার মেয়েটি কোন ক্লাশে পড়ে স্যার? 
: আমার মেয়ে স্কুলে পড়ে না। ছয় মাস বয়স। একমাত্র ছেলে ক্লাস ফোরে পড়ে।
: বারান্দায় একটা মেয়েকে দেখলাম, কাপড় নাড়ছে। সে কে?
আমি বললাম : গৃহকর্মী। শিশুবেলা থেকে আমাদে বাসায়। খুব ভালো মেয়ে।
একটু লজ্জা পেয়ে গেলেন জামাল সাহেব। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আবার স্বাভাবিক হয়ে যান। কাজের মেয়েকে নিজের মেয়ের মতো এমন সাজিয়ে গুছিয়ে রাখলে যে কেউ এমন ভুল করতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, গৃহকর্মী কীভাবে এত সুন্দর হয়! অত চিন্তা করে লাভ নেই, বড় অফিসার, বড় কাজকারবার- ওসি সাহেব মনে মনে ভাবলেন। 
দারোগা ফিস ফিস করে বললেন : আজকাল অনেক বাসায় এমন দেখা যায়। এটা একটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কলিকালে আরও কত কী দেখা যাবে!
কিছুক্ষণ পর বারান্দার মেয়েটি ড্রয়িং রুমে ঢুকল। ওসি সাহেব মেয়েটিকে দেখে বললেন : স্যার, আমি কিন্তু এ মেয়েটিকে আপনার মেয়ে মনে করেছিলাম।তাকে দেখে কাজের মেয়ে মনে হয়নি। কাজের মেয়েকে নিজের মেয়ের মতো যত্নে রেখেছেন। খুব ভালো লাগল। 
কিছুক্ষণ চুপ থেকে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে ওসি সাহেব বললেন : এ মেয়ে তুই আমার জন্য আর এক গ্লাস জল নিয়ে আয়। খুব গরম পড়ছে। তেষ্ঠা পাচ্ছে বার বার। তাড়াতাড়ি আসবি।
মেয়েটি না শোনার ভান করে মালেককে পানি আনার ইশারা দিয়ে সোজা আমার গা ঘেঁষে বসে বলল: তুমি চা খাচ্ছো না কেন?
ওসি সাহেব মেয়েটির কাণ্ড দেখে অবাক। পনের-ষোলো বছরের একটা কাজের মেয়ের সাহস দেখে চোখ তার রীতিমতো ছানাবড়া। হায় হায়, এ কী! একজন উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সঙ্গে কাজের বুয়ার এমন ঢলাঢলি, তা-ও আবার ওসির সামনে, ছি! কী অনাচার!
চায়ের কাপ হাতে নিতে নিতে আমার পাশে বসা মেয়েটিকে দেখিয়ে বললাম : ওসি, সাহেব ইনি আমার স্ত্রী।
জামাল সাহেবে যেন আকাশ থেকে পড়লেন। লজ্জায় তার ফর্সা আর নাদুস-নুদুস পুলিশি চেহারাটা ফ্যাকাশে। জগ থেকে গ্লাসে গলগল করে পানি ঢেলে বললেন : কী বললেন স্যার?
: আমার স্ত্রী।
ওসি সাহেব অনেক কষ্টে ডান হাতটা কপালে তুলে আমার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন : আসসালামুআলাইকুম।
----------------------------------------------------
সূত্র : ড. মোহাম্মদ আমীন, ভালোবাসা শুধুই ভালোবাসা গল্পগ্রন্থের একটি গল্প।
প্রকাশক : পুথিনিলয়। প্রচ্ছদ : মামুন হোসাইন
প্রাপ্তিস্থান : পুথিনিলয় স্টল, অমর একুশে গ্রন্থমেলা/২০১৮।

Wednesday, 20 December 2017

ভালোবাসা শুধুই ভালোবাসা / প্রমিত দাস লাবণী

ভালোবাসা শুধুই ভালোবাসা

ড. মোহাম্মদ আমীনের লেখা একটি গল্পগ্রন্থ। গ্রন্থটি প্রকাশিত হওয়ার আগে এর তিনটি গল্পে ফেসবুকে প্রকাশিত হয়। তিনটি গল্পই ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে যায়। স্যার আমাকে বিয়ে করুন নামের গল্পটি দিয়ে অনেক চ্যানেল ভিডিও পর্যন্ত তৈরি করে। অর্থনীতির অধ্যাপক সেলসম্যান এবং বউ’ শিরোনামের গল্পটি ফেসবুকে প্রকাশিত হওয়ার বোদ্ধামহলে সাড়া পড়ে যায়। বিদেশি নাম দেখে অনেকের মনে হতে পারে এটি কোনো গল্পের বঙ্গানুবাদ। লেখকের ভাষায়, “এটি কোনো অনুবাদ নয়, আমেরিকায় থাকাকালীন বেস্ট বাই চেইন শপে বাজার করতে গিয়ে গল্পটির প্লট আমার মাথায় আসে।” তাই চরিত্রের নাম বিদেশি। নিচে পাঠকদের জন্য গল্পটি লেখকের অনুমতি নিয়ে প্রকাশ করা হলো। অসাধারণ কিছু গল্প নিয়ে সজ্জিত এই বইটি পড়লে আপনার এবং আপনার উত্তরসুরী- সবার বিবেক আনন্দ আর ঔদার্যে বিকশিত হয়ে উঠবে।  এটি আমি নিশ্চিত বলতে পারি। এ গ্রন্থের আর একটি গল্পের লিংক দিলাম।(https://www.facebook.com/mohammed.amin.714655/posts/1642520929138028?pnref=story)। বইটি পাবেন আগামী (২০১৮) অমর একুশে গ্রন্থমেলায় পুথিনিলয়-এর স্টলে। দাম মাত্র ১২০ টাকা।  গ্রন্থটির প্রচ্ছদ করেছেন মামুন হোসাইন। 

অর্থনীতির অধ্যাপক সেলসম্যান এবং বউ 

ভদ্রলোক দোকানে ঢুকে সেলসম্যানকে বললেন : প্লাস্টিকের একটা টুল নেব। দুই ডলারের বেশি যেন না
হয়। কোনোভাবে আমি দুই ডলারের বেশি খরচ করব না।
সেলসম্যান বলল : আমার নাম কুপার। আমাদের বেস্ট বাই চেইন শপে পৃথিবীর সবদেশের সব ভালো টুল পাবেন। আরামদায়ক, টেকসই এবং আকর্ষণীয় কিন্তু দাম হাতের নাগালে। তিন ডলার খরচ করলে সেরাটা পেয়ে যাবেন। টুল ছাড়া আর কিছু নেবেন না স্যার?
ক্রেতা বললেন : ধন্যবাদ। আমি মোস আর্নেস। ফিলাডেলফিয়া ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক। চিন্তাভাবনা করে খরচ করি। আমাকে কোনো সেলসম্যান গলাতে পারেনি। আপনিও পারবেন না।
: দেখলেই বোঝা যায় আপনি প্রবল ব্যক্তিত্ববান। অপ্রয়োজনীয় সওদা ভালো নয় স্যার। আমি সেলসম্যান হলেও কখনো ক্রেতাকে অনাবশ্যক কিছু কিনতে উদ্বুদ্ধ করি না। নিজের লাভের জন্য অন্যের ক্ষতি করা অপরাধ।
মিস্টার আর্নেস একটা টুল পছন্দ করলেন। সেলসম্যান টুলটি হাতে নিয়ে বললেন : অপূর্ব। অপূর্ব আপনার পছন্দ। এমন সুন্দর টুল কোথায় ব্যবহার করবেন স্যার?
: লেকের পাশে বসে প্রকৃতি দেখব। প্রকৃতি আমার প্রেম।
: প্রকৃতিকে তারাই এভাবে উপভোগ করেন, যারা প্রকৃতির মতো সুন্দর। কিন্তু স্যার, একটা জিনিস বেশিক্ষণ দেখলে ভালো-লাগাটা কমে যায়। এই ধরুন আমার গার্লফ্রেন্ড, প্রথম প্রথম কী যে ভালো লাগত! কণ্ঠ শুনলেই শরীর রোমাঞ্চিত হয়ে উঠত। এখন গায়ে আছড়ে পড়লেও রোমাঞ্চ আসে না। প্রকৃতির ক্ষেত্রেও এমন ঘটতে পারে।
: কী করতে পারি?
: টুলে বসে মাছ ধরবেন। ফাঁকে ফাঁকে প্রকৃতি দেখবেন। চনাচুর খাবেন, সিগারেট টানবেন, বিয়ার খাবেন, ক্লান্তি এলে বিশ্রাম নেবেন। বিশ্রাম স্বপ্নের বাগান। খুব ভালো লাগবে। কিছু বড়শি দিই স্যার?
: দাও।
বড়শি দিতে দিতে সেলসম্যান বলল : খুব ভালো বড়শি দিলাম। কিন্তু স্যার বড়শি কোথায় বাঁধবেন? আমাদের খুব ভালে সুতো এবং অত্যাধুনিক ছিপ আছে। পছন্দ হবে আপনার। এক সেট দিয়ে দিই?
: দাও।
সেলসম্যান ঝুড়িতে সুতো ও ছিপ রাখতে রাখতে বললেন : অনেকক্ষণ বসে থাকতে হবে। মাংসে ব্যথা হয়ে যেতে পারে। আমাদের দোকানে ভালো কিন্তু সস্তা দামের গদি আছে। বেশ তুলতুলে। আরামের কোনো বিকল্প নেই।
: ঠিক বলেছ। একটা গদি লাগবেই। আমি অফিসের চেয়ারেও গদি ব্যবহার করি।
ধুসর রঙের একটা গদি নামিয়ে সেলসম্যান বলল : স্যার, প্রকৃতি রূপসী মেয়ের মতোই আকর্ষণীয় কিন্তু সেকেন্ডেরও বিশ্বাস নেই। খানিক রোদ, খানিক বৃষ্টি. খানিক ঝড়, খানিক বরফ। হঠাৎ যদি কড়া রোদ উঠে কিংবা ভারী বৃষ্টি হয় তখন কী করবেন?
: তাই তো! কী করব?
: একটা ছাতা এবং একটা সানগ্লাস নিয়ে যান। আমি কী স্যার ভুল বলেছি?
: না। আসলেই প্রয়োজন। দাও এবং কত দাম হলো দেখ। এবার যাব।
: যাবেন স্যার? ছাতার সঙ্গে দুই প্যাকেট চনাচুর, তিন ডজন পানির বোতল, এক ডজন বিয়ার, একটা
ড. মোহাম্মদ আমীন
ফ্লাস্ক, চার সেট কাপ-পিরিস, চারটা চামচ, দুই ব্যাগ চা, আধ কেজি চিনি দিলাম।এগুলি ছাড়া অ্যাংলিং জমে না। আর একটা কথা, এখন না বললে পরে আমার উপর মাইন্ড করবেন। ছোটো টুলটা দিয়ে হবে না। ওটায় চায়ের সরঞ্জাম রাখবেন। আর একটা বড়ো টুল দিলাম। ভারতীয় ঋষির মতো আরাম করে বসতে পারবেন।
: ঠিক আছে। দিয়েছ যখন কী আর করা। তবে অতিরিক্ত কিছু নেব না। আমি অর্থনীতির প্রফেসর।
: স্যার, ধরুন, আপনার বড়শি মাছে টান দিল। বড়ো মাছ। আপনি উত্তেজিত। এসময় হঠাৎ কোনো মশা বা পোকা কামড় দিল, কী হবে? আমি হলে স্যার, একটা ইনসেক্টিসাইড নিতাম।
: সামান্য ইনসেক্টিসাইডের জন্য এত বড়ো মাছটা চলে যাবে। দাও একটা। কিন্তু মাছ বড়ো না ছোটো এটা আমি কীভাবে বুঝব?
: একটা দূরবীন নিয়ে যান। রাতের জন্য টর্চও প্রয়োজন। একটাও অপ্রয়োজনীয় জিনিস নয়। দেব স্যার?
: দাও। আমি অর্থনীতির অধ্যাপক। অপ্রয়োজনীয় কিছু নেব না।
: বৃষ্টি এলে তো ঠান্ডা লেগে যেতে পারে। আমেরিকার বৃষ্টি বাতাস নিয়েই আসে। একটা রেইনকোট গায়ে থাকলে কষ্ট পাবেন না। দেখতেও ভালো দেখাবে। আমাদের সুইস-রেইনকোর্ট আছে। নিয়ে যান স্যার। ভাবীও পছন্দ করবেন।
: দাও। তবে হালকা নীল রঙ। ওই রঙই তোমার ভাবীর পছন্দ।
: অ্যাংলিং খুব টেনশনের বিষয়। শুধু ধূমপান করতে ইচ্ছে করে। সমস্যা সিগারেট নয়, সিগারেটের ছাই। আপনার ব্র্যান্ড?
: বেনসন।
: এক কার্টুন বেনসন, দুটি ম্যাচ এবং একটা অ্যাসট্রে দিলাম স্যার।
: দাও।
: আপনার গাড়িতে কি অ্যাংলিং ক্যাপ আছে?
: নেই।
: ক্যাপ পরে অ্যাংলিং করার মজাই আলাদা। আমি ছুটির দিন গার্ল ফ্রেন্ড অ্যাজারিয়াকে নিয়ে অ্যাঙলিং করি। সে বলে, ক্যাপ ছাড়া নাকি অ্যাংলিং ফুলহীন বাগানের মতো। একটা দিলাম স্যার।
: লাগবে যখন দাও।তবে অতিরিক্ত কিছু নেব না। আমি অর্থনীতির অধ্যাপক।
: আপনি স্যার নিশ্চয় পেনিপেক পার্ক লেকে মাছ ধরবেন, তাই না?
: তুমি কীভাবে জানলে?
: আপনার চেহারা, কথাবার্তা, পেশা আর ব্যক্তিত্ব দেখে মনে হলো এর চেয়ে ভালো লেক ফিলাডেলফিয়ায় থাকলে পেনিলেকেও যেতেন না।
: ঠিক বলেছ। আমি আসলেই সৌখিন।
: অনেক্ষণ মাছ ধরার পর ক্লান্তি আসতে পারে। ক্লান্তি মানে বিশ্রামের আহ্বান। একটা সিংগেল এয়ার মেট্রেস নিয়ে যান। বাতাস ছেড়ে দিলে রুমালের মতো হয়ে যায়। বাসাতেও ব্যবহার করতে পারবেন।
: দাও।
: বিশ্রামে গেলেও স্যার অনেক সময় ঘুম আসে না। আপনাদের মতো বোদ্ধা মানুষের বই ছাড়া ঘুম আসার কথা না। আমার চাচাও অধ্যাপক। তিনি বই ছাড়া বিছানায় যান না। আমাদের দোকানে পৃথিবীর সব দেশের সব ভালো বই আছে। আইজাক ওয়াল্টনের(Izzak Walton) দ্যা কমপ্লেট অ্যাংলার (The Compleat Angler) বইটা নিতে পারেন।
: শুনেছি বইটা ভালো। দাও।বই কখনো অতিরিক্ত হয় না।
: অ্যাংলিং খুব নেশা। ধরুন, আপনার অনেক রাত হয়ে গেল। বাসায় গিয়ে ভাবীকে ডাকলে রাগ করতে পারেন। স্ত্রীদের বিশ্বাস নেই। লেকের পাশে আমাদের একটা হোটেল আছে। খুব ভালো। আপনি ফোন করার সঙ্গে সঙ্গে হোটেলের লোক এসে জামাই আদরে নিয়ে যাবে। একটা রুম বুকিং দিয়ে দিই স্যার?
: দাও।
: সকালে আপনি বাড়ি গেলেন। এতক্ষণ কোথায় ছিলেন কৈফিয়ত চাইতে পারেন ভাবী। মাছ দেখলেও মন গলবে না। বলতে পারেন, মাছ এনেছ মসলাপাতি কই, তেল কই? কিছু মসলা আর ভাবীর জন্য কসমেটিক্স দিই?
: দাও।
: বাচ্চাদের জন্য কী দেব স্যার?
: আমার বাচ্চা নেই।
: তাহলে স্যার বব ডিলনের কয়েকটা ক্যাসেট দিয়ে দিই?
: দাও। তবে অতিরিক্ত কিছু নেব না। আমি অর্থনীতির অধ্যাপক।
: অনেক্ষণ বসে থাকলে কোমড়ে ব্যথা হতে পারে। এক প্যাকেট পেইনকিলার নিয়ে যান। কাজে আসতে পারে। বিপদের বন্ধু।
: দাও।
: বিল কতো হলো?
: দুই হাজার ছয়শ ডলার।
চমকে উঠলেন অধ্যাপক। বিল দিতে যাওয়ার আগে সেলসম্যান কুপার দৌঁড়ে এসে বললেন : বিরাট ভুল হয়ে গেছে। লেন্ডিং নেটস, ক্যাস্ট নেটস, ওজন মাপার স্কেল, ফিশিং রড হোল্ডার, প্লাইয়ারস, গ্রিফার্স, হুক রিমোভার, বাইট এলার্ম, রড কেইস, টিউব, র‌্যাকস এসব নেওয়া হয়নি। এগুলো ছাড়া ফিশিং হয় না। দিয়ে দিচ্ছি স্যার?
: দাও। আমি অর্থনীতির অধ্যাপক। আর কিছু নেব না। মোট কত হলো?
: তিন হাজার পাঁচশ ডলার।
: কিন্তু স্যার আর একটা সমস্যা আছে। এতসব জিনিস দেখলে ভাবী ক্ষেপে যেতে পারেন। তখন কী করবেন?
: তাই তো? কী করব?
: আপনাদের মতো শিক্ষিত লোক বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া করতে পারেন না। কিছু বলতেও পারবেন না, কথাগুলি কানে আসবে বজ্র হয়ে। আমি স্যার, একটা জিনিস দেব। ধরেন, আমার পক্ষ থেকে। ওটি নিলে ভাবীর সব চিৎকার অর্থহীন হয়ে যাবে। দেব স্যার? মাত্র পাঁচ ডলার।
: কী সেটা?
: এয়ার মাস্ক। কানে দিলে আণবিক বোমা ফাটলেও শুনবেন না। দেব স্যার?
: দাও। এক্ষুণি লাগিয়ে নিই। যাতে তোমার কথাও কানে না আসে। নইলে ফতুর হয়ে যাব। তুমি বউয়ের চেয়েও মারাত্মক, তোমার কথা বউয়ের চেয়েও ক্ষতিকর।

Tuesday, 5 December 2017

টিউশনি এবং ভালোবাসা / ড. মোহাম্মদ আমীন

টিউশনি এবং ভালোবাসা         

: একটা টিউশনি করবে?
: কোথায়?
: ষোলশহর।
: ছাত্র না ছাত্রী?
: ছাত্র। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে।
: ছাত্র পড়াব না।
: বিরাট পুলিশ অফিসারের ছেলে। বাবা ডিআইজি। ভালো বেতন দেবে। ভালো নাস্তা পাবে। আরে এতো বড়ো পুলিশের ঝাড়ুদার হতে পারাও ভাগ্যের। সুপারিশে চাকরিও হয়ে যেতে পারে। দুদিন পর আইজিপি হবেন।
টিউশনি শুধু টাকা নয়, টাকার চেয়ে বড়ো কিছু। এটি বিসিএস-প্রস্তুতির একটি মোক্ষম কৌশল, টাকা তো আছেই। রাজি হয়ে যাই রাজীবের প্রস্তাবে।
রাজীব বলল : বেতন মাসে আটশ টাকা।
ঊনিশশ ছিয়াশি, সে সময় আটশ অনেক মোটা অঙ্কের টাকা। এত আকর্ষণীয় বেতনের টিউশনিটা রাজীব নিজে না-করে কেন যে আমাকে দিচ্ছে বুঝতে পারছিলাম না। কিছু সমস্যা তো আছেই!
: তুমি করছ না কেন?
: আমার সময় নেই।
ডিআইজি সাহেবের ছেলের নাম ওমর। ফর্সা, তবে ধবধবে নয় কিন্তু বেশ মায়াময়। বিশাল বাসা, বারান্দায় দামি ফুলের টব। চারিদিকে সমৃদ্ধির ছড়াছড়ি। রাজীব আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে চলে গেল।
ওমর সালাম দিয়ে বলল : স্যার, বিড়াল প্রথম রাতেই মেরে ফেলা উচিত। আমার কথা নয়, আমার ডিআইজি বাবার কথা, ঠিক না?
: ঠিক। কিন্তু বিড়াল কোথায়?
: আছে স্যার, আছে। অনেক বড়ো বিড়াল।
: আমি বিড়াল মারব কেন?
: আপনাকে মারতে হবে না। আমি মারব। একটা কথা বলব?
: বল।
: আগের কথা আগে বলে দেওয়া ভালো। রাখলে আমারও লাভ আপনারও লাভ। নইলে দুজনেরই ক্ষতি। আমি চাই না আপনার ক্ষতি হোক।
: কী কথা বলে ফেল।
ওমর বলল : আপনার বেতনের চল্লিশ পার্সেন্ট আমাকে দিয়ে দিতে হবে। আপনার বেতন আটশ টাকা। চল্লিশ পার্সেন্টে হয় তিনশ বিশ টাকা। তবে আমাকে তিনশ টাকা দিলেই হবে, বিশ টাকা আপনার বখশিস। কী বলেন স্যার?
প্রথমে মাথাটা ঝিম ঝিম করে ওঠে। ইচ্ছে করছিল ঘুরিয়ে একটা চড় দিই। হাত এগিয়ে নিয়েই থামিয়ে ফেলি। মুহূর্তের মধ্যে স্বাভাবিক করে ফেলি আমাকে। তারপর সহজ গলায় আদর মেখে বললাম : কম নেবে কেন বাবা?
: এমনি।
: না, আমি পুরো তিনশ বিশ টাকাই দেব।
: তাহলে স্যার ভাংতি দিতে হবে। আমি একশ টাকার নিচে ভাংতি রাখি না।
: তাই হবে।
বিচিত্র অভিজ্ঞতার আশায় আমার মনটা ফুরফুরে হয়ে ওঠে। মজার হবে টিউশনিটা, দেখি কতদূর যেতে পারে ওমর। মাস শেষ হওয়ার কয়েক দিন আগে আমি একটি খামে করে তিনশ বিশ টাকা ওমরের হাতে তুলে দিই।
ওমর যথাসময়ে টাকা পেয়ে খুশি।
হাসি দিয়ে বলল : স্যার, আপনি খুব ভালো মানুষ।
আমি বললাম : তুমি আমার কাছ থেকে শিখছ আর আমি শিখছি তোমার কাছ থেকে। পরস্পরের বেতন যথাসময়ে দিয়ে দেওয়া উচিত। তাহলে শ্রমের মর্যাদা মাসের প্রথমদিকে হাসার সুযোগ পায়।
ওমর বলল : থ্যাংক ইউ স্যার। সব মানুষ যদি আপনার মতো হতো!
চার মাস পর ডিআইজি সাহেব পড়ার রুমে এলেন। এতদিন তাকে একবারও দেখিনি, বেশ গম্ভীর চেহারা, দেখলে সমীহ আসে। চোখের চশমায়, দামটা পুলিশের পোশাকের মতো ঝিলিক মারছে, হাতের ঘড়িতে আরও বেশি।তিনি ওমরের একটি খাতা হাতে তুলে নিয়ে দেখতে দেখতে বললেন : মাস্টার সাহেব, আপনার বেতন চারশ টাকা বাড়িয়ে দিলাম।
: কেন স্যার?
আমরা পুলিশের লোক। গুণীর কদর করতে জানি। এ পর্যন্ত কোনো শিক্ষক আমার ছেলের কাছে দুই মাসের বেশি টিকেনি। প্রত্যেকে আমার ছেলেটাকে বকা দিয়েছে, মেরেছে, অশ্রাব্য কথা বলেছে। ছেলে কেবল আপনারই প্রশংসা করেছে। আপনি নাকি অনেক ভালো পড়ান।
তিনি একটা কলম ও একটা ডায়েরি আমার হাতে দিয়ে বলেন : এগুলোর আপনার উপহার।
: থ্যাংক ইউ।
কলমটা ছিল সম্ভবত পার্কার। তখন তো আর মোবাইল ছিল না, ওই সময় পার্কার ছিল আমাদের কাছে স্মার্ট ফোনের মতো লোভনীয়।
ডিআইজি সাহেবে চলে যেতে ওমর বলল : স্যার।
: তুমি কী কলম আর ডায়েরি হতেও ভাগ চাইছ?
ওমর হেসে বলল : না স্যার। বস্তুতে আমার আগ্রহ নেই। টাকা হলে সব বস্তু পাওয়া যায়।
: তবে?
: আমার পাওনা এখন চারশ আশি টাকা। আমি আশি টাকা নেব না, একশ টাকা নেব। তার মানে পাঁচশ টাকা।
: ঠিক আছে। খুব বেশি না হলে আমার বেশি দিতে কষ্ট লাগে না। তুমি আমার শিক্ষক, তোমাকে বিশ টাকা বেশি দিতে না-পারলে আমার জ্ঞান অর্জন হবে কীভাবে?
ওমরের হাসিটা আরও বিস্তৃত হলো। কমিশন নিলেও পড়াপাড়ি বেশ ভালোই হচ্ছে।আরও তিন মাস কেটে গেলে। এরমধ্যে, আমার বেতন আরও দুইশ টাকা বেড়ে গেছে। ওমরকে এখন টাকা দিতে কষ্ট হচ্ছে না। জীবনে প্রথম শেখলাম-- দেওয়া- নেওয়ার মাহাত্ম্য। ওমর একটা জীবন্ত স্মার্ট ফোন।
সেদিন বাইরে খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। ওমরকে অন্যদিনের চেয়ে বেশ আনমনা মনে হচ্ছে।
বললাম : কী হয়েছে?
: স্যার, আমাকে একটা কাজ করে দিতে হবে।
: কী কাজ?
: একটা চিঠি লিখে দিতে হবে।
: চিঠি তো লিখেই দিই।গতকালও দিয়েছিলাম।
: স্কুলের চিঠি নয়।
: কোন চিঠি?
: আমার প্রেমিকা; সরি স্যার, বান্ধবীকে দেওয়ার জন্য।
: কী লিখব?
: আপনার মতো করে আপনি লিখে দেবেন। আমি তাকে ভালোবাসি। তাকে না- দেখলে বুকটা কেমন মোচড় খায়। ধকধক করে কলিজা, কিছু ভালো লাগে না। সে খুব সুন্দর ইত্যাদি।
চিঠি লিখে দিলাম গভীর ভাষায়, প্রেমের মমতায়।
রাস্তায় এসে ইচ্ছেমতো হাসলাম। ওমর আর রেহাই পাচ্ছে না। বাসে উঠতে গিয়ে দেখি, ফারহাদ। আমার সতীর্থ এমদাদের ছোটো ভাই। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছে। সাবজেক্টটা ঠিক মনে পড়ছে না।
আমাকে সালাম দিয়ে বলল : ভাইজান, আমাকে একটা লজিং দেবেন?
: আমি তো লজিং নিয়ে থাকি না। এমদাদের কাছে অনেকগুলো লজিং আছে। আমাকেও বলেছে, কাউকে পেলে খবর দেওয়ার জন্য। তাকে গিয়ে বলো।
: বলেছিলাম, দেবে না।
: কেন?
: আমাকে আগে শিবিরের সদস্য ফরমে স্বাক্ষর করতে হবে। আমি শিবির করব না, সেও আমাকে লজিং দেবে না। লজিংগুলির মালিক নাকি শিবির।
ফরহাদকে বিদায় করে নিজের রুমে চলে যাই। শুক্রবার বন্ধুদের নিয়ে বেড়াতে যাবার কথা কিন্তু যাওয়া হলো না। ওমর খবর পাঠিয়েছে, শুক্রবার তাদের বাড়ি যেতে হবে। তার শুভ জন্মদিন।
কী নিয়ে যাই?
অনেক চিন্তাভাবনা করে ওমরের বান্ধবী নিহা নিশিতাকে দেওয়ার জন্য একটা চিঠি লিখি। ওমর চিঠি পড়ে এত খুশি হয় যে, সে মাসের পুরো কমিশনটাই আমাকে ফেরত দিয়ে দিল।
অবাক হয়ে বললাম : ফেরত দিলে যে?
ওমর আমাকে আরও অবাক করে দিয়ে বলল : আপনার লেখার সম্মানি। স্যার, চিঠিটা একদম ফাটাফাটি হয়েছে।
লেখার সম্মানি! আমি চমকে উঠি। লেখার প্রথম আয়, এ তো বিশাল কারবার! তাহলে কেন এতদিন লিখিনি! ওমরের উৎসাহে উৎসাহিত হয়ে পত্রিকায় লেখা শুরু করি। তারপর আস্তে আস্তে লেখা আমার নেশা হয়ে যায়।
যতই গল্প করি, যতই প্রেমপত্র লিখে দিই না কেন, লেখপড়ায় ওমরকে এমন কৌশলে ব্যস্ত রাখি যে, সে ধীরে ধীরে বইয়ে ঝুঁকে পড়ে। তার সব আনন্দ অন্যান্য জায়গা হতে বইয়ের পাতায় এসে ভীড় করতে শুরু করে। আগে তার বাবাকে বলত চকলেটের কথা, এখন বলে বইয়ের কথা। আগে ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীতে আলমিরা ছিল ভর্তি; এখন সেখানে ঠাঁই পেয়েছে এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিট্রানিকা, পৃথিবীর বিখ্যাত লেখকদের নানা বই। আমার কাছ থেকে নাম নিয়ে যায় বইয়ের, নিয়ে আসে তার বাবাকে দিয়ে। দেশে না পেলে বিদেশ থেকে। কত দামি দামি বই, আমার কাছে মনে হতো -- সামর্থ্যবানদের ইচ্ছাই প্রাপ্তি।
আরও তিন মাস পর আমার বেতন হয় পনেরশ টাকা। বিশাল অঙ্ক, অনেক সরকারি অফিসারও তখন এত বেতন পেতেন না। এখন ওমরের পাওনা গিয়ে দাঁড়ায় ছয়শ টাকায়।
মাসের শেষদিন ওমরকে ছয়শ টাকা দিতে যাই। লজ্জায় চোখটা নিচু করে ফেলে সে। আগের মতো দ্রুত হাত এগিয়ে দিচ্ছে না : সরি স্যার।
: নাও তোমার টাকা।
: লাগবে না স্যার।
: আরে নাও। আমি অত টাকা দিয়ে কী করব?
: স্যার, একমাসে যতটাকা আপনাকে দিই, আমি একদিনে তার চেয়ে অনেক বেশি দামের চকলেট খাই। একটা চকলেটের দাম একশটাকা, দিনে বিশটা চকলেট আমি একাই খাই। বাবার হুকুমে সুইজারল্যান্ড থেকে আসে। আপনার বেতন মাসে মাত্র দেড় হাজার টাকা।
তারপরও আমি বললাম : নাও।
: লাগবে না স্যার।
: আগে লাগত কেন?
তাস খেলতাম, নিহা নিশাতকে দিতাম। এখন তাস খেলা, সময় নষ্ট মনে হয়। তার পরিবর্তে বই পড়ি। নিহা নিশাতকে যতক্ষণ দিই ততক্ষণ খুশী থাকে, শুধু চায় আর চায়। বই শুধু দিয়ে যায়, কিছুই চায় না।
আমি সাফল্যের হাসি নিয়ে বের হয়ে আসি।
বার্ষিক পরীক্ষার পর ওমরদের বাসায় যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। ডিআইজি সাহেব বলেছেন এক মাস পর থেকে আবার পড়ানো শুরু করতে। আমার মতো ভালো মাস্টারকে তিনি ছাড়বেন না। বদলি হলে সেখানে নিয়ে যাবেন।পনের কী বিশদিন পর দেখি আমার মেস-বাসার সামনে একটা বিরাট গাড়ি দাঁড়িয়ে। দেখলে বোঝা যায় বড়ো পুলিশ অফিসারের গাড়ি।
হন্তদন্ত হয়ে বের হয়ে আসি।
ওমর আর তার বাবা গাড়ি হতে নামছেন।
ডিআইজি সাহেব বললেন : মাস্টার সাহেব, আমার ছেলে বার্ষিক পরীক্ষায় তৃতীয় হয়েছে। এর আগে কোনোদিন পঞ্চাশেও ছিল না। এক বছরের মধ্যে আপনি আমার ছেলেটাকে পরিবর্তন করে দিয়েছেন। এটি আমার কাছে অলৌকিক মনে হয়।
প্রশংসা আমার মনে অদ্ভুত এক আনন্দ বইয়ে দিল।
ডিআইজি সাহেব আমার হাতে একটা ঘড়ি তুলে দিয়ে বললেন : আমার ছোট ভাই আমার জন্য সুইজারল্যান্ড থেকে এনেছেন। আপনাকে দিলাম। এটি কোনো বিনিময় নয়, উপহার; ভালোবাসার নিদর্শন।
আনন্দে আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। এমনভাবে কেউ আমাকে কোনোদিন এমন উপহার দেননি।
ওমর আমার পায়ে ধরে সালাম করে বলল : স্যার, আপনি আমাকে বদলে দিয়েছেনে।
ডিআইজি সাহেব ওমরের এমন আচরণে আবেগপ্রবণ হয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরেন : মাস্টার সাহেব, ওমর আমাকেও পাত্তা দিত না। এ পিচ্চি ছেলের কাছে আমি ছিলাম কেবল টাকার-ঝুড়ি। আপনি তাকে জানোয়ার থেকে মানুষ করে দিয়েছেন। বলুন কীভাবে সম্ভব হয়েছে?
বললাম : ভালোবাসা, শুধুই ভালোবাসা।
: আপনি আমার কাছ থেকে কী চান?
: ভালোবাসা, শুধুই ভালোবাসা।
-------------------------------------------------------------------------------------------
সূত্র : ড. মোহাম্মদ আমীন, ‘শেখা সাদির বোকামি’ গল্পগ্রন্থের একটি আত্মচরিতমূলক গল্প।
ঈষৎ সংক্ষেপিত।
[এই গল্পটি নিয়ে একটি কিশোর উপন্যাস লেখা হয়েছে। নাম ‘ তিনে দুয়ে দশ’। প্রকাশক পুথিনিলয়, পাবেন আগামী একুশে গ্রন্থমেলায় পুথিনিলয়ের স্টলে।]