Monday, 22 January 2018

গল্প আমার সুবর্ণ প্রহর / ড. মোহাম্মদ আমীন

গল্প আমার সুবর্ণ প্রহর মোশারফ খানের একটি গল্পগ্রন্থ তিনি কোনো পেশাদার লেখিয়ে নন তিনি একজন ভ্রমণপিপাসু উদার
মনের বোদ্ধা মানুষ। ভ্রমণ করেন আর দেখেন গভীর দৃষ্টিতে এবং দেখেন আর মনে গেঁথে নিয়ে কলমের ডগা দিয়ে কাগজে সাজান বাক্যের কাব্যিকতায়। ফুরফুরে মনের এই মানুষটির সঙ্গে কথা বললে মনে হয়, আন্তরিকতার সাগর নিয়ে বৈসাবী উৎসবে মাতিয়ে দিতে এসেছেন। কথার ছন্দে বাক্যের পরতে পরতে অভিজ্ঞতারাশি আনন্দে আনন্দে জীবন্ত হয়ে কাহিনির নন্দিত পরিসজ্জায় অভিভূত করে দেয়। তাঁর লেখাগল্প আমার সুবর্ণ প্রহরগ্রন্থেও এর পরিচয় পাওয়া গেল। সম্ভবত, ‘গল্প আমার সুবর্ণ প্রহরলেখকের চতুর্থ গ্রন্থ। এর আগের গ্রন্থগুলি পড়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি। নাই হোক, একটি গল্পগ্রন্থ পড়ে আমি মোশাররফ খানের লেখার যে পরিচয় পেয়েছি, তা নতুন লেখক হিসেবে তাঁর গভীর প্রজ্ঞার অনুস্মারক হয়ে আছে।গল্প আমার সুবর্ণ প্রহরগ্রন্থের পাণ্ডুলিপি পড়ে আমার মনে হয়েছে, এগুলি কেবল গল্প নয়। অল্পকথায় প্রকাশিত নিজের জীবনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির চলমান অবিকল্প


সুবর্ণ শব্দের বর্ণিল প্রখরতার উন্মেষরাশি আলোময় মাধুর্যে বিকশিত হয়ে প্রহর প্রকৃষ্টতার চিরন্তন প্রবহমান সজীব ব্যাকুলতায় আপতিত হলে যে বিচ্ছুরণের আবেশ চোখ-মন আর অনুভবে বাঙ্ময় শিহরন ঢেলে দেয়, তেমন একটি অনাস্বাদিত অনুভূতির
স্বাদ পেতে হলে, মোশাররফ খানের গল্গগ্রন্থ সুবর্ণ প্রহর আপনাকে পড়তেই হবে। এগুলি গল্প বলা হলেও, আমার মনে হয় গল্প নয়; বাস্তবতার কোরকে পরিপুষ্ট জীবনের অভিজ্ঞতার তিল তিল অনুব্যঞ্জন। আঠোরোটি গল্প নিয়ে চয়িত গ্রন্থটির প্রতিটি গল্পের স্বাদ আলাদা, প্রতিটি লাইনের মনস্তুষ্টি স্রোত এবং নিপুণ ভঙ্গিমায় এগিয়ে যাওয়া বাক্যসমগ্রের পেছনে বর্ণাঢ্য আগ্রহের প্রমত্ত বিগ্রহ উচ্চকিত। যেন জীবন-প্রেম, বিরহ-অভিসার, কষ্ট আর বঞ্চনার প্রগাঢ় অনুভূতি প্রকৃতির লাস্যে নিনাদিত বুদ্ধীন্দ্রিয় শোভা। গ্রন্থের আঠারোটি গল্প অষ্টাদশী উর্বশীর চর্বিহীন অবয়ব হয়ে মথিত করে দেয় প্রাণ। এমন মাথনে নিজেকে হারিয়ে দিতে কে না চায়?


তাহলে চলুন, গল্পগুলি একবার পড়ে নেয়া যাক। পড়তে হলে বইটি কিনতে হবে। বইটি প্রকাশ করেছে, পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা। প্রকাশক শ্যামল পাল। বইটি পাওয়া যাবে, অমর একুশে গ্রন্থমেলায় পুথিনিলয় এর স্টলে। প্রচ্ছদ করেছেন মামুন হোসাইন। অসম্ভব রহস্যাবৃত প্রচ্ছদের কানায় কানায় সুবর্ণতায় বিকশিত প্রহরগুলি কীভাবে বর্তমান থেকে অতীতে গিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে এবং আবার ফিরে আসছে নতুন অনাবিলতায়- তা অনুভব করুন মোশাররফ খানেরগল্প আমার সুবর্ণ প্রহরগ্রন্থে ডুবদিয়ে। এই ডুব আপনার মনে বিভোর প্রশান্তির ছোঁয়া দেবে সাবলীল প্রেমের নিকষ চুমোয়

মেথর থেকে প্রফেসর / রাজীব আহমেদ

মেথর থেকে প্রফেসর কথাটি ড. মোহাম্মদ আমীন এর লেখা ‘যেখানেই থাক ভালো থেক গোপাল’ ‍উপন্যাসের সারাংশ। এটি একটি অসাধারণ মানবতাবাদী উপন্যাস এবং মানুষের প্রতি মানুষের বিরল ভালোবাসার একটি হৃদয়গ্রাহী দৃষ্টান্ত। প্রতিনিয়ত অসংখ্য প্রতিভা আমাদের চোখের আড়ালে ঝরে পড়ছে। কার মধ্যে কী প্রতিভা লুকিয়ে আছে জানা যায় না। তাই কাউকে অবহেলা করতে নেই। রাস্তার মধ্যে যে শিশুটি  ভিক্ষা করছে, সে হয়ত সামান্য সুযোগ পেলে হয়ে যেতে পারে অসামান্য কেউ। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত প্রত্যেককে যথাসাধ্য সহায়তা করা। তাহলে পৃথিবী সত্যিকার সাফল্যে মুগ্ধকর ভালোবাসায় সপ্রাণ হয়ে ওঠবে। এবার দেখা যাক, ড. মোহাম্মদ আমীনের লেখা ‘যেখানেই থাক ভালো থেক গোপাল’ বইটির সংক্ষিপ্তসার।


মেথরের শিশুসন্তান গোপাল পিতৃহীন মায়ের নাম প্রভাতি। তিনি সেরাজুল হক নামের এক ধনী লোকের বাড়ির মেথর। প্রভাতির বড়ো ছেলে গাড়ি চাপা পড়ে মারা গিয়েছিল কয়েক বছর আগে। গাড়িতে চাপা পড়ার ভয়ে প্রভাতি গোপালকে গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখে কাজ করেন প্রচণ্ড শীতে গোপাল চিৎকার করে কাঁদে, মশা কামড়ায়। যেখানে বেঁধে রাখা হয় সেখানে মলমূত্র ত্যাগ করে। সেরাজুল হক সাহেবের বাড়ির গৃহশিক্ষক গোপালের দুরবস্থা দেখে মর্মাহত হন। গোপালের কষ্ট তাকে অস্থির করে তোলে। একদিন ভোরে গৃহশিক্ষক শিশু গোপালকে শিকলমুক্ত নিজের রুমে নিয়ে আসেন এরপর থেকে প্রভাতি যতক্ষণ মেথরের কাজ করতেন গোপাল গৃহশিক্ষকের রুমে থাকত গৃহশিক্ষক, গোপালকে পড়াতে শুরু করেন কয়েক মাসের মধ্যে বুঝতে পারেন গোপাল অত্যন্ত মেধাবী। এতে তিনি গোপালের প্রতি আরো উৎসাহিত এবং সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠেন।

গৃহশিক্ষক নিজ উদ্যোগে গোপালকে স্থানীয় নন্দীর হাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি করিয়ে দেন নিজের প্রচণ্ড অভাব সত্ত্বেও গোপালের যাবতীয় খরচ বহন করে  যেতে থাকেন  গোপাল হয়ে ওঠে গৃহশিক্ষকের অতি আদরের একজন। গোপালকে নিজের সন্তানের মতো তার লালন করে যাচ্ছিলেন গৃহশিক্ষক। গোপাল পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি পায়। এতে গৃহশিক্ষক আরো অনুপ্রাণিত হন। সপ্তম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার কয়েক দিন গৃহশিক্ষকের সরকারি চাকরিতে যোগদানের আদেশ আসে। গৃহশিক্ষক চাকরিতে যোগদান করেন কয়েক মাস গোপালের সঙ্গে চিঠিপত্রে যোগাযোগ থাকলেও নানা কারণে ধীরে ধীরে তা বন্ধ হয়ে যায়। শিশু গোপালের ইচ্ছা থাকলেও গৃহশিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ করার কোনো উপায় ছিল না। আস্তে আস্তে গৃহশিক্ষক গোপালের কথা বহুলাংশে বিস্মৃত হয়ে যায়।

 ষোল বছর গৃহশিক্ষক পর জানতে পারেনগোপাল অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পেয়েছিল এসএসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষায়ও সে স্ট্যান্ড করেছিল বর্তমানে আমেরিকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিজ্ঞানের প্রফেসর মেথরের ছেলে গোপাল কীভাবে প্রফেসর হলো তাই এই উপন্যাসের আলেখ্য বইটির প্রকাশক মাওলা ব্রাদার্স।

Sunday, 21 January 2018

বইমেলায় আপনার শিশুর জন্য শ্রেষ্ঠ তিনটি বই / ডা. প্রণব কুমার চৌধুরী

 অমর একুশে গ্রন্থমেলায় অনেক হাজার বই প্রকাশিত হয়। এতগুলি বই থেকে আপনার প্রিয় শিশুকিশোর সন্তানের জন্য অতি কার্যকর ও শিক্ষামূলক বই খুঁজে বের করা কঠিন। হাজার হাজার বই থেকে আপনার শিশু ও কিশোরের অত্যন্ত উপযোগী তিনটা বইয়ে বিবরণ দিলাম। আপনার প্রিয় সন্তানকে আনন্দের সঙ্গে শিক্ষা ও জীবন গড়ার উপাদানে বিভূষিত করার জন্য বই তিনটি অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বইতিনটির লেখক ড. মোহাম্মদ আমীন। প্রকাশক পুথিনিলয়, পাবেন, অমর একুশে গ্রন্থমেলায় পুথিনিলয়-এর স্টলে।
১.    তিনে দুয়ে দশ

ভালোবাসা দিয়ে সবকিছু জয় করা যায়। ভালোবাসা দিয়ে যে কোনো কঠিন হৃদয়কেও বিগলিত করে ফেলা যায়।
ভালোবাসা পেলে যে কোনো দুষ্টমতি শিশুও সুবোধ হয়ে যায় সপ্রাণ চঞ্চলতায়। ভালোবাসা দিয়ে অতি অবাধ্য এবং লেখাপড়ায় প্রচ- অমনোযোগী শিক্ষার্থীর ইচ্ছাকেও প্রতিভায় প্রতিভায় বিকশিত করে তোলা যায়। ভালোবাসায় বারিত করা গেলে অতি বর্বর ব্যক্তিও আদর্শ মানুষে পরিণত হয়। মূলত  এগুলিই উপন্যাসটির বিষয়বস্তু। মা-বাবা, দাদা-দাদি, নানা-নানি, প্রবীণ, সর্ব পর্যায়ের অগ্রজ, বস, শিক্ষক-শিক্ষিকা, সিনিয়র প্রমুখ-সহ যে কোনো গুরুজন, বন্ধু, সহপাঠি, প্রিয়জন ও ভালোবাসার মানুষকে যদি এমন কোনো বিশেষ উপহার দিতে চান, যে উপহার পেলে তিনি খুশি হবেন এবং উপহার দাতার প্রতি তার প্রেম-ভালোবাসা, মায়ামমতা, দয়া-দরদ, স্নেহ-প্রীতি, হার্দিক নৈকট্য, সহানুভূতি, ধৈর্য ও বিবেচনাবোধ বেড়ে যাবে; তাহলে, তাকে ‘তিনে দুয়ে দশ’ উপন্যাস উপহার প্রদানই হবে
ড. মোহাম্মদ আমীন
সবচেয়ে উত্তম এবং কার্যকর। এটি হতে পারে যে কোনো দিবসে যে কোনো অনুষ্ঠানে যে কোনো বয়সের এবং যে কোনো সম্পর্কের প্রিয়জনকে দেওয়া শ্রেষ্ঠ উপহার। বেউ যদি একটি উপন্যাস পড়ে তার শিশু বা জুনিয়রদের নিজের ইচ্ছেমতো গড়ে তোলার কার্যকর কৌশল আয়ত্ত করতে চান তাহলেও বইটি পড়া অপরিহার্য।। এটি এমন একটি বই, যার সারাংশ ফেসবুকে প্রকাশিত হওয়ার পর বোদ্ধামহলে বিপুল সাড়া পড়ে গিয়েছিল। ভাইরাল আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল এর ব্যতিক্রমতার কাহিনি। এটি একটি সর্বজনীন উপন্যাস। বইটি প্রত্যেকের হৃদয়কে নাড়া দিতে সক্ষম হবে। বইটি পড়লে হ্রাস পাবে অস্থিরতা, অধৈর্য এবং মানসিক বিপর্যয়। বইটির অন্তর্নিহিত শিক্ষা লালন করা গেলে যে কেউ অতি উচ্ছৃঙ্খল শিশুসন্তানকেও মনের মতো করে গড়ে তুলতে পারবে।


৪.     ভালোবাসা শুধুই ভালোবাসা

বইয়ের চেয়ে উত্তম উপহার এবং ভালোবাসার চেয়ে শ্রেষ্ঠ কাজ আর নেই। আর এই দুটির সমন্বয় যদি ঘটানো যায় তাহলে যে কারো জীবন হয়ে ওঠে মধুর এবং ভালোবাসাময়। জীবন হয়ে ওঠে স্বর্গীয় প্রাপ্তির চেয়ে আরো বিরল প্রত্যাশিত সুখের অনন্ত উৎস। প্রিয়জন প্রত্যেকের  আছে, প্রত্যেকে চায় তার প্রিয়জন শ্রেষ্ঠ হোক কিন্তু নানা কারণে হয় না; করা যায় না। কিন্তু কেন করা যায় না এবং কীভাবে প্রিয়জনকে প্রত্যাশিত লক্ষ্যে উপনীত করা যায় এবং  এতে
ভালোবাসার ভূমিকাই বা কী তা এই গল্পগ্রন্থের মূল আলেখ্য। প্রত্যেকের চাওয়া-পাওয়া এবং রুচি বা ইচ্ছা ব্যক্তিবিশেষে ভিন্ন। কিন্তু ভালোবাসার ক্ষেত্রে এবং বস্তু হিসেবে বইয়ের ক্ষেত্রে সবার ইচ্ছা অভিন্ন। ভালোবাসা পেলে যে ব্যক্তি খুশি হয় না সে পশুও নয়, জড়; মরা লাশ। বই পেয়ে যে আপ্লুত হয় না, সে লাশের চেয়েও বিরক্তিকর। তবে বই হতে হবে প্রিয়জনের মনকে নাড়া দেওয়ার মতো। ভালোবাসা শুধুই ভালোবাসা এমন একটি বই। এটি যে কোনো বয়সের এবং যে কোনো পর্যায়ের প্রিয়জনকে উপহার দেওয়া যায়। এটি এমন একটি বই যা প্রিয়জনকে দিলে আপনার প্রতি শুধু ভালোবাসা নয়, গভীর কৃতজ্ঞতার  নিবিড় আবেশে বেড়ে যাবে পারস্পরিক প্রীতি। ভালোবাসার মূল্য কী এবং কীভাবে, কোথায় কাকে ভালোবাস দিতে  হয় এবং কীভাবে তা স্থায়ী করা যায়- তা এই গল্পগ্রন্থের পাত্রপাত্রীদের আচরণ, কথোপকথন এবং কাহিনি বিন্যাসে মেলে ধরা হয়েছে। জীবন ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে অর্জিত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সহজ-সরল ভাষায় পরিবেশিত বইদুটি হতে পারে ভালোবাসা দিবস-সহ যে কোনো দিবসে যে কোনো অনুষ্ঠানে যে কোনো বয়সের এবং যে কোনো সম্পর্কের  প্রিয়জনকে দেওয়া আপনার শ্রেষ্ঠ উপহার।

 ২.     বড়ো হুজুর ও বরুমতির মেলা

শিশুকিশোর হতে যুবক-যুবতী এবং পরিণত বয়স্ক Ñ এককথায় সবার উপযোগী এই উপন্যাসটি একদিকে যেমন হৃদয়
বিদারক  অন্যদিকে তেমনি প্রত্যশার বিরল স্নিগ্ধতা আর ভালোবাসা ও কাঠিন্যের বৈচিত্র্যময় উপমায় ভরপুর এক অতুলনীয় কিশোর উপন্যাস। বড়ো হুজুর, বরুমতি এবং বড়ো হুজুরের শিশু নাতিকে নিয়ে উপন্যাসটি রচিত। বরুমতি  কোনো মেয়ে নয়। একটি  খাল। বরুমতির তীরে প্রতিবছর চৈত্রসংক্রান্তিতে একদিনের জন্য হিন্দুদের মেলা বসত।  অনেক শিশুকিশোর  বরুমতির মেলায় যেত।  কিন্তু বড়ো হুজুর তার নাতিকে যেতে দিতেন না। ঘরে আটকে রাখতেন। বড়ো হুজুর তার শিশু নাতির মেলায় যাওয়া রোধ করার জন্য কত নৃশংস হয়ে উঠতেন এবং কী জঘন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতেন, অপরদিকে শিশুটি মেলায় যাওয়ার জন্য কী করতেন তার শোকাবহ ভাষাচিত্র বইটির মূল বিষয়বস্তু। এত গোঁড়া হওয়া সত্ত্বেও বড়ো হুজুর কত দেশপ্রেমিক এবং কীরূপ সমাজ সচেতন ছিলেন সেই বিষয়টিও উপন্যাসটিতে উঠে এসেছে।  উপন্যাসটি তৎকালীন ধর্মীয় গোঁড়ামির নির্যাতনে পিষ্ঠ এক অসহায় শিশুর জীবনচরিতের একটি করুণ চিত্র। যে কারুণ্য আবার নির্যাতনকারীর স্নেহে অমিয় হয়ে উঠত হার্দিক মমতার পারিবারিক পরশে।  এটি শুধু উপন্যাস নয়, যেন কালের পরিক্রমায় চলে আসা একটি জীবন্ত জীবনবন্দনা। যার গুরুত্ব ইতিহাসের চেয়েও অধিক। বইটি আপনার সংগ্রহকে করবে সমৃদ্ধ এবং চিন্তাকে করবে ঋদ্ধ।









Thursday, 4 January 2018

নোবেল সাহিত্য পুরস্কার ১৯০১-২০১৭ গ্রন্থ আলোচনা / ড. অমিত কুমার কুণ্ড


বলা যায়, সৌভাগ্যবশত ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশের ড. মোহাম্মদ আমীনের লেখা একটা বই আমার হাতে পড়ে।
বইটির নাম  ‘নোবেল সাহিত্য পুরস্কার ১৯০১-২০১১’, প্রকাশক আগামী প্রকাশনী, বাংলাবাজার, ঢাকা। ঢাকার বই আমরা বেশি একটা পাই না। যেগুলি পাই সেগুলি খ্যাতিমান লেখকের কিন্তু মানসম্মত নয়। সাধারণত বাংলাদেশের খ্যাতিমান লেখকদের  লেখা মানস্মত হয় না। এটি আমার ধারণা। ভিন্নমত থাকতে পারে।বাংলাদেশের অধিকাংশ খ্যাতিমান লেখক কুম্ভীলক নামে পরিচিত। যাই হোক, ড. মোহাম্মদ আমীনের  এই বইটি পড়ে আমি অভিভূত হলাম। অভিভূত হলাম এই কারণে যে, তিনি এখানে এমন কিছু তথ্য দিয়েছেন, যা বাংলা ভাষায় লেখা  অন্য কোনো বইয়ে  আমি  পাইনি। অধিকন্তু ১৯০১ থেকে ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত  যেসব লেখক, সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেছেন, তাদের সাহিত্যকর্ম-সহ নানা বিষয়ে বৈচিত্র্যম বর্ণনা বইটিতে রয়েছে। মুগ্ধ হয়ে আমি লেখক ড. মোহাম্মদ আমীনকে একটা পত্র দিয়েছিলাম । এরপর হতের তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্ক। আস্তে আস্তে যা বন্ধুত্বে গড়ায়।

মাস কয়েক আগে জানতে পারলাম, ড. মোহাম্মদ আমীন বইটিকে পরিবর্ধন ও পরিমার্জন করে ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিকদের  অন্তর্ভুক্ত করে ‘নোবেল সাহিত্য পুরস্কার ১৯০১-২০১৭’ নামের একটি পাণ্ডুলিপি তৈরি
ড. মোহাম্মদ আমীন
করেছেন।আমি পাণ্ডুলিপি পাঠানোর অনুরোধ করলে লেখক দ্বিধা না করে পাঠিয়ে দিলেন।  পাণ্ডুলিপি পড়ে আমি আবার মুগ্ধ হলাম। মুগ্ধ হলাম এজন্যই যে, এই গ্রন্থে নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিকদের জীবনী এমন কিছু তথ্য-সহ পরিবেশন করা হয়েছে, যাতে  যে কোনো স্তরের পাঠক মনকে আকৃষ্ট করার মতো পর্যাপ্ত উপাদান রয়েছে।  ১৯০১ খ্রিষ্টাব্দ হতে নোবেল পুরস্কার প্রদান শুরু হয়। তখন থেকে ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত যেসব ব্যক্তি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তাদের সাহিত্যকর্ম, জীবনী, জীবন-জীবিকার নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, সংসার জীবন, পারিবারিক বলয়, রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্র প্রভৃতি এই গ্রন্থে সহজ সরল ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে। আমি মনে করি, সাধারণ পাঠক, বোদ্ধা, পেশাজীবী, ছাত্র-শিক্ষক, রাজনীতিক, গবেষক এবং বিসিএস-সহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের জন্য ‘নোবেল সাহিত্য পুরস্কার (১৯০১-২০১৭)’  বইটি অত্যন্ত কার্যকর সংগ্রহ হিসেবে বিবেচিত হবে।

লেখকের কাছ  থেকে জানতে পারি বইটি এবার আগামী প্রকাশনী থেকে নয়,  বাংলাদেশের শিখা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হচ্ছে এবং অমর একুশে গ্রন্থমেলায় শিখা প্রকাশনীর স্টলে বইটি পাওয়া যাবে।

লেখক  পরিচিতি :  শিক্ষাবিদ, গবেষক। ভারতীয় বংশোদ্ভুদ ব্রিটিশ।

Tuesday, 2 January 2018

সুভাষ সর্ব্ববিদ্যা : কাব্যে-গল্পে অভিজ্ঞতার নির্ঝর প্রসর / ড. মোহাম্মদ আমীন

সুভাষ সর্ব্ববিদ্যা : কাব্যে-গল্পে অভিজ্ঞতার নির্ঝর প্রসর

(খসড়া)

ফেসবুকে বিভিন্ন জনের আইডি উল্টোতে গিয়ে হঠাৎ চোখে পড়ে যায় সুভাষ সর্ব্ববিদ্যার আইডি। ইচ্ছা ছিল একটু
দেখে অন্য কারো আইডিতে চলে যাব। কিন্তু একটা স্ট্যটাস পড়ার পর আর একটা পড়ার ইচ্ছা প্রবল হয়ে উঠল। এভাবে পড়ার ইচ্ছা ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছিল। লেখা নয়, জন্য রোমাঞ্চিত হওয়ার মতো কিছু জীবনালেখ্য। কবিতার পর গল্প, গল্পের পর আবার কবিতা এভাবে সজ্জিত ফেসবুক আমাকে ধীরে ধীরে আকৃষ্ট করে তুলছিল।  মোহময় করে তুলছিল তমার উপস্থিতি, তমার নির্মাল্য। বিভ্রান্ত করে দিচ্ছিল গল্পের অনুভবে নিবিড়-মজ্জায় ঝড় তোলা জীবন্তিকা। সুভাষ সর্ব্ববিদ্যার লেখা কোনো কল্পমাত্র নয়, বাস্তবতার জীবন্ত বিন্যাস, অভিজ্ঞতার মর্মর নির্যাস। সর্ব্ববিদ্যার আইডি আমাকে এত তৃপ্তি দিয়েছে যে, শেষ হওয়ার পর আরও কিছু জানার আশায় রাজ্যের সব অতৃপ্তি ঘিরে ধরে। এটাই আসলে শিল্পসম্মত লেখার বৈশিষ্ট্য। এমন বৈশিষ্ট্য যার  লেখায় আছে, তিনি নিশ্চয় ভালো লেখক। সুভাষ সর্ব্ববিদ্যা একজন ভালো লেখক।
  
মূলত তিনি গল্পকার। তবে কবিতাতেও সমান দক্ষ। প্রথম তাঁর যে বইটি আমি পড়ি সেটি ‘বিদীর্ণ বালুচর ও অন্যান্য’। চোরাটান, বিদীর্ণ বালুচর, হাশেম আলী মাস্টার, ফ্রেমে বন্দি ছবি, বুবানি, দুর্মতি এবং আলো-ছায়া ও একটি ঘুণপোকা- এ ছয়টি ছোটগল্প নিয়ে গ্রন্থটির অবয়ব। জীবনের তিলতিল অনুভব থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতার সমন্বিত প্রকাশ গল্পগুলোকে অসাধারণ করে তুলেছে। এ শুধু গল্প নয়, প্রাত্যহিক জীবনের বাস্তব রূপায়ণে কর্মজীবনের সান্নিধ্য সোহাগÑ কষ্টের বিমূর্ত সোহাগে গড়ে ওঠা জীবনবৃক্ষের অপরাজেয় গল্প। পড়া শুরু করলে না-শেষ করে ছাড়া যায় না। 

এমন জীবনধর্মী গ্রন্থ, পাঠকের অনুভবকে শাণিত করে তুলতে পারে জীবনবোধের পূর্ণ-মহিমায়। গ্রন্থের প্রচ্ছদটাও হয়েছে চমৎকার। তবে লেখাগুলোর ফন্ট স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা ছোট করায় আমাদের মতো বুড়োদের পড়তে কষ্ট
সুভাষ সর্ব্ববিদ্যার গল্পগ্রন্থ
হয়। হয়তো খরচ কমানোর জন্য এমনটি করা হয়েছে। ‘বিদীর্ণ বালুচর ও অন্যান্য’ বাংলা সাহিত্যের ছোটগল্প-সম্ভারে একটি অনবদ্য সংযোজন। সুভাষের গল্প জীর্ণ জীবনের ভিন্নকথার লাল জুঁই। রক্তগুলি এখানে বিকট উর্মীতে জীমুত হয়ে আকাশে ছুটে যায়। লাইনে লাইনে কষ্টকর মুগ্ধতা, শিল্পীর মজ্জাগত পুষ্টতায় রসরস মাদকতা এবং শ্রমঘামের মাঝে শব্দ আর শব্দের পাখিরা শিশুর মতো অর্থহীন অর্থে অবিরাম গেয়ে যায় কিচির মিচির। তাঁর গল্পের ভাষা প্রাঞ্জল এবং নির্ঝর নিপাটে ব্যাকুল মাদকতায় শিরশির উৎসব। প্রতিটি বাক্য সহজবোধ্য, সরল এবং অকপট। এখানে চমৎকারিত্বের বিদিক দিশা রঙহীন অগণিত রঙের খেলায় ভেসে বেড়ায় মেঘের মতো বিস্ময় হয়ে বুকের কষ্টে মনের যাতনায়।

কবিতায় শব্দ চয়নে সুভাষের ব্যতিক্রমতা দৃষ্টির পরে আরও দৃষ্টির উপলব্ধক প্রাপ্তি। এ এক অনবদ্য অনুভব, পরিণতির সঙ্গে শব্দের গাঁথুনি মিলে সৃষ্টি করে অদ্ভুদ মাদকতা। পাঠক হারিয়ে না গিয়ে পারে না শব্দের আহ্বানে। দেখুন, কীভাবে তিনি তুলে ধরেছেন জীবনকে সমাহিত বিচূর্ণতায় :
“তোমার মায়াবী ঠোঁটের উষ্ণ চুম্বন
আগুনের ইতিহাস খুঁজে।
তোমার পত্র লেখা শুধরে দেবার সুবোধ স্যার এখন আর নেই।
-----
তমা,এখনও কি তুমি শুনতে পাও 
শরতের শিউলি ঝরা গান?” 

 লাইনগুলি সুভাষের কবিতার কিন্তু কবিতার চেয়েও মনোহর, কষ্টের চেয়ে বিধুর, সুরের চেয়ে মুগ্ধকর, উপলব্ধির চেয়েও বাস্তব এবং অনুভবের চেয়েও  রোমাঞ্চকর। কবির মন দর্শনের অন্তরালে আলোড়িত না হলে, সুকুমারচিত্ত কৌমার্যের উন্মাদনায় নিয়মের রশি ছিঁড়ে বের হওয়ার প্রয়াস নিয়মহীন নিয়মের মতো গর্জে না উঠলে এমন বাক্য আসে না। প্রতিটি বাক্য যেন অভিজ্ঞতার সমাহারে উথলে পড়া আবেগের লালায়িত বাষ্প। কষ্টগুলিকেও তিনি মিষ্টতার আবরণে উপভোগ্য করে তুলেন নিখাদ অভিমানে : 
তুমি আসবে ভেবে
চাঁপা বনে যাইনি।
কলঙ্কিনী চাঁদ কি
সবুজাভ হয়েছিল?” [সুভাষ সর্ব্ববিদ্যা]

সুভাষ সর্ব্ববিদ্যা সুভাসিত ভূষণে বিভুষিত সাধারণ জীবনের একজন অসাধারণ মানুষ। সহজসরল এবং অমায়িকতা তার মজ্জাগত বৈশিষ্ট্য। মুখ থেকে বের হয়ে আসা নরম শব্দের পরম আতিথেয়তা মুহূর্তে রাশি রাশি ¯েœহ হয়ে টেনে
নিতে পারে অপরিচিত যে কাউকে। অল্প পরিচয়েও সে আমার প্রিয় একজন। অবশ্য, প্রিয় হতে সময় নয়, মনোবৃত্তিক ঔদার্যের প্রয়োজন। এটি তার পুরোপুরি রয়েছে। সুভাষ লিখেন কষ্ট নিয়ে। মানুষের কষ্ট, বোধের কষ্ট, জীবনের কষ্ট, মরণের কষ্ট, সুখের কষ্ট শান্তির কষ্ট। তাঁর দৃষ্টি সাধারণ কোনো দৃষ্টি নয়, দার্শনিক আলোর অসীম দৃষ্টি। তাই সুখেরও যে কষ্ট আছে তা-ও তিনি দেখতে পান। বৃষ্টির শব্দে তিনি কান পাতেন না শুধু, নাকও পাতেন ঘ্রাণ নিতে। তাঁর ‘বৃষ্টির ঘ্রাণ’ গল্পে এটি বিমূর্ত। কবিতায় তিনি অদম্য। ছোটো ছোটো লাইনে সহজ শব্দগুলি জীবনের জটিল মুহূর্তগুলিকেও সাগরের ফেনিল বিশালতায় নিমজ্জিত করে দেন। কষ্টকেও তিনি তাই ভোগ করতে পারেন সুখের প্রশান্ত মাদকতায়। নিজেকেও বাদ দেন না, তীক্ষ্মনাগ্র তীরের ফলা দিয়ে ফলা ফলা করে দেন : 
“স্বার্থপরের সুমার হলে
                                   ‘নামটা আমার আগে দিও। [ সুভাষ সর্ব্ববিদ্যা]

জীবনের নানা ঘাতপ্রতিঘাত তাঁর গল্পকবিতার রক্তমাংস এবং প্রতিনিয়ত অর্জিত অভিজ্ঞতা এর নিঃশ্বাস। তাই যত কষ্ট আসুক, যতই বিপন্নতায় মুষড়ে পড়–ক, তিনি অকুতোভয় নেই। তিনি প্রেমের বাগে, বাঘের কাঁধে ছুটে বেড়াতে পারেন সখীর কৃষ্ণরৌপ্যের সন্ধানে। অন্তদর্শনে সুভাষ অতুলনীয়। কেবল ভিতর-বাহির নয়, এ দুটির ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়াও তাঁর চোখ এড়ায় না। কোনো ফাঁক না রেখে দ্বিধাহীন বলে যান : 
                           “বৈচিত্র্যময় মানব জীবন বাইরে থেকে পরিলক্ষিত হয়না তবুও সে প্রাণবন্ত। পুষে রাখে কষ্ট                                      যন্ত্রনা। এরপর....অনেক কথা হলো। শৈশব  কৈশোর যৌবন....। আজ দেখে এলাম তার,                                          সুখের কালশিটা!” 

এমন আবেগময় বাক্যগুলি পড়লে  মনে হয়, আমাদের দৃষ্টি তার দৃষ্টি হতে অনেক পিছিয়ে। দুঃখের সঙ্গে আজন্ম সান্নিধ্য তাঁকে দুঃখের রাজ্যে সুখের অভিবাসন গড়ে দিয়েছে। তাই শত কষ্টও সুভাষকে ভাঙতে পারে না বরং কষ্টকে উপহাস করে দিব্যি এগিয়ে যান। কষ্টকে প্রশ্নের উদরে ঢুকিয়ে তিনি নিয়ে আসেন ফুটফুটে শিশু। নিজের দুর্ভাগ্যকে সৌভাগের নায়ে ভাসিয়ে প্রশ্ন করে বসেন ভগবানকে :

         “-- ভাগ্যবানের বোঝা নাকি ভগবান বয়।
             তমা, ও তমা,
            তুমি কি জানো- দুর্ভাগার বোঝা কে বয়?” 
প্রকৃতি আর জীবনের বাস্তবতা সুভাষ সর্ব্ববিদ্যাল লেখার ক্যানভাস, প্রেমরঙে বিচ্ছেদ আর প্রাত্যহিকাতায় মসলায় তিনি গড়ে তুলেন গল্পের প্রাসাদ, স্বপনের জগতৎ, সুড়কি তার কষ্ট। সুভাষের গল্পগুলি পড়ার পর অনুভূতির তীব্রতা ছড়িয়ে পড়ে শরীরের প্রতি কোষে, বিষ্ফোরণ ঘটনায় আনবিক বোমার মতো। দিব্যদর্শনে মন বিকশিত হয়ে ওঠে  ভালোলাগার পরশে। জীবনের কষ্টগুলি গল্পের  বাক্যে ক্রমশ বিশাল হয়ে ধরা দেয় চোখের নেশায় এবং হৃদয়ের অনুভাষ্যে। তাঁর গল্পে আছে ভালোবাসা, ভালবাসায় আছে অুনরাগ আর ওই অনুরাগের ক্ষণ চিহ্নকে কাছেই ভিড়তে দেয় না অতৃপ্তির অবরোধে। তাই কষ্টতেও তাঁর অতৃপ্তি নেই। জীবনের চেয়ে তৃপ্তি আর কী আছে! তার কোনো কিছুতে পরোয়া নেই :
                  “স্থির বিদ্যুতের মতো
                   জমে আছে বুকের এক ধার।
                  তবুও জীবন চলে
                 নির্ভীক বাধাহীন দূর্বার।”

রাগ তাঁর অনুরাগের ভেতর এবং সুখ তার কষ্টের ভিতর ঢুকে এলোমেলো করে দেয় সব পরিকল্পনা, শুধু কল্পনাটাই বেঁচে থাকে সঞ্জীবনী সুরার মতো পরিকল্পনাহীন  প্রেমের অপ্রতিরোধ্য গতি হয়ে। 

মানুষকে তিনি দেখেন নিজের চোখে কিন্তু নিজের মতো করে নয়, প্রত্যেকের মতো করে। এভাবে দেখার জন্য যে চোখ, যে দৃষ্টি এবং যে ধৈর্য ও অন্তর প্রয়োজন সবকিছু তার আছে। সাধারণত মানুষ অন্যকে দেখে নিজের চোখে অন্যের
হায়াৎ মামুদ ও সুভাষ সর্ব্ববিদ্যা
মতো করে। কিন্তু সুভাষ দেখেন নিজের চোখে নিজের মতো করে প্রত্যেকের চেতনার রসে সিক্ত হয়ে অনুভবের নীহারিকায়। এখানেই তাঁর দৃষ্টি আর সাধারণ্যের দৃষ্টির পার্থক্য। অন্যের অনুভূতিতে তাঁর গভীর বেদনাবোধ অন্ধবিলাসের কল্পিত কৌমার্য। তিনি লিখতে পারেন, প্রকাশ করতে পারেন- অনেকে পারেন না। তাতে কী! তিনি অন্যের ভাবনাগুলি ঠিক চিনে নিতে পারেন এবং নিজের ভাষায় প্রকৃতির মতো সার্বজনীনতায় প্রকাশ করতে পারেন। এটি তার গল্পের বিরল সার্থকতার নিলয় মাধুর্য। সুভাষের চেতনা হতে বিকশিত কথামালা রবীন্দ্রনাথের মাধুর্যে আধুনিকতার পরশ, দর্শনের গহ্ববের অনুসন্ধানের কৃতিত্ব। তিনি জানেন, ভালোবাসাটা এক একজনের কাছে এক একরকম। তাই তার প্রকাশভঙ্গীটাও ভিন্ন। এই ভিন্নতা কী বুঝতে পারা এবং সহজ সরল ভাষায়  ছোটো পরিসরে ব্যক্ত করতে পারাই গাল্পিকের সবচেয়ে বড়ো গুণ। এ গুণটা বেশ আলোকিতভাবে আছে জনাব মামুনে। অপরের হৃদয়কে পাঠ করার বিরল গুণ রয়েছে তাঁর। তাই অবলীলায় বলতে পারেন লীলাময় বিবরণ :

                       “কিছু অভিমান। কিছু কষ্ট। এর থেকে বেরিয়ে আসছে কেউ কেউ। কেউ বা বেরিয়ে এসে জয়ী                                  হয় অর্হনিশ। কেউবা হারায়ও। ঐ হারুয়াদের দলে নতুন নাম তুলেছি এই আমি। কারণ-আমি                                  হারতে জানি। হারতে শিখেছিলাম সেই কৈশোর বেলায়,আমার চিরদুঃখীনি মা'র কাছে। সেই                                   সময়  উদ্বেলিত হতাম হেরে যাওয়ার আনন্দে।”

সুভাষের লেখক সত্ত্বা জাগতিক সূত্রের এলেবেলে ঝিলে ভেসে ভেসে নেচে বেড়ানো উৎপল, তবে এই উৎপল কণ্টকাচ্ছাদিত। সাধারণত মানুষ প্রেমের পর লেখক হন, ভালোবাসার চড় লেখক হতে বাধ্য করে কিন্তু সুভাষ উল্টো। লেখক হওয়ার পরই তিনি ভালোবাসতে শিখেছেন। তার ভালোবাসা শুধ মানুষ নয়, কষ্টরাও তার ভালোবাসা পাত্র। কষ্টে কষ্টে তার চেতনা হয়েছে ঘাতসহ। এমন অভিজ্ঞতা তাঁকে করেছে আবেগহীন আবেগে ঋদ্ধ। অন্যদিকে আত্মবিশ্বাসী ও পরিসুদ্ধ। লেখার সময় আবেগকে টেনে ধরে নিজের ইচ্ছেমতো গল্পকে গল্পের লক্ষ্যে ধাবিত করার বিরল গুণ রয়েছে তাঁর। লেখক হওয়ার পর তিনি পুরোই লেখক, ভালোবাসায় পুরোটা ভালোবাসা এমন মজ্জাগত একাগ্রতা সুভাষের গল্পের স্বভাবগত মাধুর্য  : 

              “কোন নৈঃশব্দ রাতে স্তব্ধতার বুক চিরে
                বেরিয়ে আসে, এক অভিশপ্ত জীবনের গল্প।
              ঐ মুহুর্তে এক আনাড়ি লেখক দর্শক হয়। খুঁজে ফিরে
              জীবনের স্পন্দন ! [ সুভাষ সর্ব্ববিদ্যা]।

কয়জন লেখকে এমন বাঙময় চঞ্চলতা রয়েছে, রয়েছে এমন  বৈচিত্র্যময় তারল্য। যেভাবে চিন্তা করা যায়, যেভাবে
সুভাষ সর্ব্ববিদ্যা, শামসুদ্দিন শিশির, হায়াৎ মামুদ, ড. মোহাম্মদ আমীন
টানা যায় সেভাবে করা যায়। অনুভবের এমন বহুমুখীনতা  লেখার বিরল সৌন্দর্য। নবীন লেখক হলেও তার গল্পে অনেক পরিপক্কতার ছাপ, এটি বয়সের ছাপ নয়, দক্ষতার নিদর্শন। পড়তে পড়তে অন্য জগতে চলে যেতে হয়।  তাঁর গদ্যকে পৃথক করা যায় না কবিতা হতে। তবে পার্থক্য আছে। তাঁর গদ্যে পদ্যের গভীরতা আছে কিন্তু পদ্যের মতো জটিল নয়, পাঠক সহজে পড়ামাত্র বুঝে নিতে পারেন প্রতিটি অক্ষরের বিন্যাসের প্রতিবিন্যাস। তাঁর গল্প কবিতার মতো ছন্দোময় কিন্তু আবেশটা কবিতার চেয়ে ঢের কোমল এবং গানের চেয়ে অভিনব। কারণ এখানে অতৃপ্তির যে নেশা, তা নিটোল প্রেমিকের জোয়ারভাঙা বিরহের চেয়েও প্রবল। তাই সুভাষের গল্প কবিতার বিজয় কেতন, সুরের মোহনায় দর্শনের অনুভূতি এবং প্রেমের নিসপিস কম্পনে  জীবনের অভিধান। প্রকৃতিকেও তিনি তার প্রেম আর জীবন-জীবিকার প্রাপ্তি অপ্রাপ্তিতে ডেকে আনেন সাদরে :

              “সেদিন ছিল পোয়াতি জ্যোস্না
               কী এক অজানা আবেশে
               জড়িয়ে ধরলে তুমি, ঠাঁই নিলে 
              আমার বিদীর্ণ বুকে। 
             সেদিন  পোয়াতি জ্যোৎস্নাও স্বাক্ষী ছিল।” 
যতই কষ্ট থাকুক জীবনে, যতই অপ্রাপ্তি থাকুক দিবনদে, যতই হাহাকার থাকুক তমরার গলায়, তবু সুভাষ সুভাষিত তার জীবনবোধের নন্দিতে। তাই সব ছাপিয়ে উজাড় হয়ে ওঠে তার কণ্ঠ নবজাতকের মতো নবকোরকের স্বপ্নীল প্রাতে  প্রশ্নাতীত লাস্যে : 
               “তুমি আমার একটা দিনের দিবস নও মা। ৩৬৫টি দিনই এক একটি দিবস। সারাদিনের ক্লান্তি শেষে                        যখন  ঘরে ফিরি। তোমার কষ্ট মাখা মুখে ফুটে উঠে এক চিলতে হাসি। আর ওই হাসিই আমার যাপিত                     জীবনের  এক  সমুদ্র সুখ। মুহুর্তে আমি ভুলে যাই আমার অতীত বর্তমান সবকিছু সবকিছু।”

শুধু গল্পে নয়, কবিতাতেও তার একই প্রার্থনা, একই সুর ধ্বনিত হয় সহাস্য কষ্টের আনন্দমাল্যে। যা দিয়ে কবি, তাঁর পাঠককে এটাই শেখাতে চাইছেন যে, জীবনের চেয়ে বড়ো উপহার আর হতে পারে না। জীবনের তুলনায় কষ্ট সমুদ্রের তুলনায় এক বিন্দু জলের চেয়েও নগণ্য। অতএব কেন, আমাদের আকুতি থাকবে, কেন থাকবে প্রাপ্তির কান্না। এ তো জীবনকে আরো কষ্টময় করে তুলবে। সুতরা অপ্রাপ্তি ভুলে প্রাপ্তি মগ্ন হবো প্রেমের শীৎকারে। ভালোবাসায় ফেলে সব কষ্ট আর অপ্রাপ্তিকে শেষ করে দেব।
“একেতো বিদ্যুতের ভেল্কিবাজি
তার 'পরে অসহ্য গরম
তবু ও কমতি নেই
ভাই -বোনের অটুট বন্ধন..।